পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে আনন্দ-উৎসব ও ত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে পড়লেও সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল ব্যাপক তৎপরতা। নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও ঈদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আগাম প্রচারে নেমেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
ক্ষমতাসীন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ইতোমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল স্থানগুলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সে অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। তবে জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। বাজেট প্রাপ্যতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনের তারিখ এখনো নির্ধারিত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা বসে নেই। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে তারা নানা সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। ঈদের আগে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন টানানোর পাশাপাশি অসহায় মানুষের মাঝে ঈদসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অনেকে একাধিক পশু কোরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ করেছেন। ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া, মুসল্লিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমেও ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন তারা।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে অন্তত ছয়জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পাশাপাশি মেম্বার পদপ্রত্যাশীরাও বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। কোরবানির মাংস বিতরণ, দরিদ্র মানুষের সহায়তা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন তারা।
একই ধরনের প্রচারচিত্র দেখা গেছে ঝিনাইদহের অন্যান্য উপজেলা, মাগুরা, ফরিদপুর এবং ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতেও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ শুভেচ্ছা সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাজধানীর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেও মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রত্যাশীদের প্রচারণা দৃশ্যমান হয়েছে। অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই দেখা গেছে ঈদ শুভেচ্ছা জানানো পোস্টার ও ফেস্টুন। অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী ঈদের দিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং কোরবানির মাংস বিতরণে অংশ নেন।
যদিও বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকদের কার্যক্রম ভবিষ্যৎ প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন নগরবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন। ঈদ উপলক্ষে গরুর হাট তদারকি, বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং ঈদের নামাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএমএ রাজ্জাক জানান, মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা ইতোমধ্যে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ‘চলো বদলে দেই ঢাকা উত্তর’ স্লোগানে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। ঈদের আগে ও পরে গরুর হাটে সেবামূলক ক্যাম্প, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য অপসারণে সহায়তা, দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ ও কোরবানির মাংস বিতরণ এবং ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার মতো নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীকেও বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডে দলীয় নেতাদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে। দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রত্যাশী আব্দুস সাত্তার সুমন জানান, তার উদ্যোগে সাতটি গরু কোরবানি করে ৪০০ পরিবারের মধ্যে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের পোশাক বিতরণ এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি ইতোমধ্যে কয়েকটি সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন জানান, ঈদের সময় তাদের প্রার্থীরা সরাসরি গণসংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা চালিয়েছেন।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে সক্রিয় হয়েছে। দলটির দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির মাংস বিতরণসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে নির্বাচনি আবহ তৈরি হতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
