কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার নতুন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২০ মে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন পায়।
২০০৮ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং মোবাইল অপারেটরদের অর্থায়নে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের ভবনে ‘ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার’ (এনএমসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার’ (এনটিএমসি) রাখা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্থাটির কার্যক্রম নিয়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর নজরদারি এবং ফোনে আড়িপাতার কাজে এনটিএমসিকে ব্যবহারের অভিযোগ ছিল ব্যাপকভাবে আলোচিত।
২০২৩ সালে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২২ সালে এনটিএমসি ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনীর সাবেক এক কমান্ডারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘প্যাসিটোরা’ থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারে ‘স্পিয়ারহেড’ নামের একটি নজরদারি ব্যবস্থা ক্রয় করে। যদিও সে সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনটিএমসি সরাসরি ইসরাইল থেকে প্রযুক্তি কেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি তারা স্বীকার করে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে এনটিএমসি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দেশের ৯৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক সংস্থাটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান।
পরবর্তীতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে অধ্যাদেশ জারি করে এনটিএমসি বিলুপ্ত করে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ নামে নতুন কাঠামো গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। চলতি বছরের এপ্রিলে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নজরদারি কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হয়।
এই আইনি সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার ‘কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ (পর্যায়-১)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল, দুটি মাল্টি-ফাংশনাল হাইব্রিড প্যাকেট ব্রোকার, তিনটি সুইচ ম্যানেজমেন্ট কার্ড এবং আংশিকভাবে সংযুক্ত ছয়টি ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রকল্পটির সংবেদনশীলতার কারণে নয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয় এবং দুটি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে রাজধানীর ধানমন্ডিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসি’-কে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুমোদিত দর দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।
সরকারের দাবি, নতুন সরঞ্জামগুলো মূলত ইন্টারনেট নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ব্যবহৃত হবে। তবে নজরদারি অবকাঠামো নিয়ে জনমনে যে বিতর্ক বিদ্যমান, এই কেনাকাটা সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
সরকার বলছে, সংশোধিত আইনের আওতায় বর্তমানে যেকোনো ধরনের নজরদারি বা আড়িপাতার ক্ষেত্রে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
