ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সম্প্রতি মুসলমানদের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন, বাড়িঘর ভাঙচুর ও হামলার পাশাপাশি কোরবানির পশু জবাই নিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্যের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ। তারা শুভেন্দুকে বাংলাদেশিদের ব্যাপারে নাক না গলাতে এবং ধর্ম নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য না দিয়ে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, এ দেশের হিন্দুসমাজ তথা সনাতন ধর্মের লোকজন ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে একত্রে বসবাস করে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপন করে এবং সব মিলিয়ে এ বছরও উত্তরাঞ্চলে সম্প্রীতির বন্ধনে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট সভাপতি এবং সনাতন ধর্মের ব্যবসায়ী নেতারা জানান, শুভেন্দু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতীয় মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব কোরবানিতে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার শুরু হয়েছে, তা বাংলাদেশের সনাতন ধর্মের লোকজন কখনো সমর্থন করে না। তাঁরা তাঁর এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
গরু খামারি রবি দাস ও সুমতি রানী বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন থেকে গরু লালন-পালন করে কোরবানির সময় বিক্রি করে থাকেন এবং তাঁদের গরু বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেন মুসলমানরা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গরু বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন এমন খবরে তাঁরা জানান, শুভেন্দু এটি করে ঠিক করেননি। সে দেশের সনাতন ধর্মের অনেক গরিব লোকজন পুরো বছর ধরে গরু লালন-পালন করে কোরবানির সময় বিক্রি করেন, যা বন্ধ করে দিয়ে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আঘাত করেছেন। তবে এসব বিষয় বাংলাদেশের সম্প্রীতির পরিবেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুরোহিত জানান, হিন্দু ধর্মে কোথাও গরুকে গোমাতা বলা হয়নি এবং গরু জবাই করে গোশত খাওয়া যাবে না সেটাও লেখা নেই। হিন্দু ধর্মের সব ধরনের অন্যায়-অত্যাচার ও জুলুম-নির্যাতন না করার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারপরেও সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন এটি তাঁর অজ্ঞতা। তিনি সঠিকভাবে হিন্দু ধর্ম চর্চা করলে কখনো অন্য ধর্মের লোকজনদের ওপর এ ধরনের জুলুম-নির্যাতন এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও ব্যবসায়ী প্রণয় বণিক বলেন, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ ধর্মীয় সহাবস্থান ও সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়ে যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে হিন্দু ধর্মকে উগ্রপন্থি বানানোর চেষ্টা করছেন, এটা হিন্দু সমাজ কখনো সমর্থন করে না। এ দেশে সব ধর্মের লোকজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়েই নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাকে।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা মিল চাতাল ব্যবসায়ী প্রদীপ কুমার বলেন, বহু আগে থেকে তাঁরা এই দেশে বসবাস করছেন এবং এখানে ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করতে গিয়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে এমন রেকর্ড নেই। কিন্তু সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে মুসলমানসহ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার শুরু করেছেন তাতে সে দেশের সংখ্যালঘুরা সংকটে পড়েছে। তবে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মের লোকজন কখনো শুভেন্দুর কথায় কান দেয়নি এবং দেবেও না। তাঁরা যেভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে সহযোগিতা করে আসছেন সেভাবেই ভবিষ্যতে চলবেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি উত্তম সাহা বলেন, বাংলাদেশের সনাতন ধর্মের লোকজন সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক অধিকার নিয়ে ভারতের মুসলমানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের অধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু ভারত সরকার সে দেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটি করে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করেছেন। এখানে একত্রিত থেকে তাঁরা বাংলাদেশ রক্ষায় একাত্তরে জীবন দিয়েছেন এবং চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও দেশ ও গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সাবেক এমপি অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী জানান, বাংলাদেশ সরকার সব সময় ভারত সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করলেও ভারত সরকার বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সঠিক মূল্যায়ন করতে চায় না। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেভাবে সুখে-শান্তিতে সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করে, ভারতের সংখ্যালঘুরা তা পারে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান থেকে শুরু করে নিম্নবর্ণের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যে অত্যাচার শুরু করেছেন তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্ট নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলা ভারতের বর্ডারবেষ্টিত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর উগ্র কথাবার্তা এবং ধর্মীয় উসকানির কোনো প্রভাব পড়েনি। এই জেলাগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়নি এবং উত্তরাঞ্চল তথা এ দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর কথায় বাংলাদেশে কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে না এবং ভবিষ্যতেও তাঁরা ঠিক এভাবেই তাঁদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে যাবেন।
