২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের কেরালায় এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে হুংকার দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কাশ্মীরের উরিতে এক জঙ্গি হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহতের জবাবে তিনি পাকিস্তানকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ভারত সফলভাবে তাদের বিশ্ব দরবারে একঘরে করতে পেরেছে এবং এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যাতে সারা বিশ্বে পাকিস্তান সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কিন্তু সেই হুংকারের এক দশক পর, ২০২৬ সালে এসে ভূ-রাজনীতির সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে। ভারতকে স্তব্ধ করে দিয়ে পাকিস্তান আজ মোটেও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে কোনো দেশ নয়। তারা চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তিগুলোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে টানার পাকিস্তানি কূটনৈতিক চাতুর্য যেমন এর পেছনে কাজ করেছে, তেমনি নরেন্দ্র মোদী সরকারের বেশ কিছু কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তও ভারতের এই পুরোনো নীতিকে সম্পূর্ণ ‘ব্যাকফায়ার’ বা বুমেরাং করে তুলেছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক মোড় পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ২০২৫ সালের মে মাসের চার দিনব্যাপী এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ সামরিক সংঘাত। কাশ্মীরের পহেলগামে ২৬ জন পর্যটক নিহতের জবাবে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান ও মিসাইল হামলা চালালে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়।
২০২৫ সালের ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে আকস্মিক ঘোষণা দেন, দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ‘পূর্ণাঙ্গ ও তাত্ক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সাথে সাথেই এই যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পের সক্রিয় ও দূরदर्शी নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন।
বিপরীতে, ট্রাম্পের সাথে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মোদী সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করেন। ভারত সবসময়ই কাশ্মীর বা পাকিস্তানের সাথে যে কোনো বিরোধকে সম্পূর্ণ ‘দ্বিপাক্ষিক’ বিষয় হিসেবে গণ্য করে এসেছে, যেখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ তাদের নীতিবিরুদ্ধ।
ফলস্বরূপ, জুন ২০২৫ সালে মোদী যখন কানাডা সফরে ছিলেন, তখন ট্রাম্প তাঁকে ওয়াশিংটনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও মোদী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ফোনে ট্রাম্পকে জানিয়ে দেন, এই যুদ্ধবিরতি কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল। মোদীর এই অস্বীকৃতি ট্রাম্পের অহংবোধে আঘাত করে এবং ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরায়।
ট্রাম্প প্রকাশ্যেই দাবি করতে শুরু করেন যে তিনি একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়েছেন এবং যুদ্ধের প্রথম দিনই পাকিস্তানের মাটিতে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সরাসরি জড়িত থাকার কোনো অকাট্য প্রমাণ ভারত দিতে না পারায়, বিশ্ব দরবারে প্রচারণার লড়াইয়ে পাকিস্তান জয়ী হয়। এর পুরস্কার হিসেবে ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের বিরল আমন্ত্রণ জানান, যা ভারতের জন্য ছিল চরম অস্বস্তিকর।
২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে মোদী তাঁর পররাষ্ট্র নীতিতে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বলেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে ভারত সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পাকিস্তানের ওপর সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে Islamabad-এ অনুষ্ঠিতব্য দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে ভারত।
ভারতের এই অনড় অবস্থানের কারণে গত এক দশকে সার্কের কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি, যা কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক একাত্মতাকে ধ্বংস করেছে। সার্কের বিকল্প হিসেবে ভারত ‘বিমসটেক’-কে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও তা শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হতে পারেনি।
ভারত যখন সার্ককে প্রায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে, তখন পাকিস্তান অত্যন্ত চতুরতার সাথে তার প্রতিবেশী যেমন, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ এবং মালদ্বীপের সাথে সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি ঘটিয়েছে। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের সাথে Islamabad-এর ‘লৌহ কঠিন’ বন্ধন আরও মজুত হয়েছে।
গত বছর ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান চীনের তৈরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি বেইজিং সফরে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে বুকে টেনে নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সম্পর্ককে অক্ষয় বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদী সরকারের আরেকটি বড় ভুল ছিল ভারতের ঐতিহ্যগত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা জোটনিরপেক্ষ নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এবং জো বাইডেনের আমলে ভারত আমেরিকার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং চীনের উত্থান ঠেকাতে গঠিত ‘কোয়াড’ জোটে সক্রিয় অংশ নেয়। আমেরিকার চাপে পড়ে ভারত প্রথমে ইরান থেকে সস্তা খনিজ তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যা দিল্লির জ্বালানি অর্থনীতি ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতিতে বড় আঘাত ছিল।
সবচেয়ে বড় policyগত পরিবর্তন আসে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রত্বকে সমর্থন করে আসলেও মোদীর আমলে তারা ইসরাইলের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা এবং অন্যতম প্রধান মিত্রে পরিণত হয়। ഗাজায় চলমান গণহত্যা নিয়ে ভারত কখনোই সরাসরি ইসরাইলের নিন্দা করেনি। উল্টো গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা ও ইসরাইল যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু করার ঠিক আগের মুহূর্তে, মোদী তেল আবিব সফর করেন।
ইসরাইলের সাথে ভারতের এই প্রকাশ্য মাখামাখি মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম দেশগুলোর সাথে দিল্লির সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ঠিক এই সুযোগটি লুফে নিয়েছে পাকিস্তান। গত সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব পাকিস্তানের সাথে একটি ঐতিহাসিক ‘যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে, যা মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক গুরুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
তাছাড়া, ভারতের অভ্যন্তরীণ politics-এ ক্রমবর্ধমান মুসলিম-বিদ্বেষ, মসজিদে হামলা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। ২০২২ সালে বিজেপি মুখপাত্রের মহানবী (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের जেরে মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের তলব করা হয়েছিল। পাকিস্তান এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ওআইসি’র মাধ্যমে জাতিসংঘে প্রতি বছর ১৫ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া বিরোধী দিবস’ পালনের প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয়, যা ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান খুব দ্রুত আমেরিকার নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চাহিদাকে ধরতে পেরেছে। পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান সরবরাহের চুক্তি করেছে এবং দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং ও খনিজ খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি ভারত সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির কথা বললেও ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক বজায় রেখেছে, আইটি পেশাদারদের জন্য অত্যন্ত জরুরি এইচ-১বি ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে এবং সস্তা রাশিয়ান তেল কেনার অপরাধে ভারতকে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন সফর করেছেন এবং ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে প্রয়োজনে পাকিস্তান সফরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, অথচ বিগত এক বছরেও তিনি ভারত সফরে যাননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন ও Islamabad-এর এই নতুন সখ্যতা স্থায়ী হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং ভারতের অর্থনীতি ও বিশাল বাজারের কারণে মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তবে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাপ্রধানরা এখন বুঝতে পারছেন যে, পাকিস্তানকে পুরোপুরি একঘরে করার নীতি ব্যর্থ হয়েছে।
কাশ্মীরের মতো একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিকে সামরিক বুটের নিচে চেপে রেখে কিংবা চীন-پاکستان অক্ষকে অবহেলা করে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দেশের সাবেক জেনারেল ও কূটনীতিকরা ইতিমধ্যেই পর্দার আড়ালে ‘ব্যাক-চ্যানেল’ বা গোপন বৈঠক শুরু করেছেন। চরম জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর কমিয়ে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যদি উচ্চপর্যায়ের সংলাপের মাধ্যমে একে অপরের উদ্বেগের সমাধান না করে, তবে এই উপদ্বীপে যেকোনো সময় আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে।







