প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী বাগেরহাটের হযরত খান জাহান আলীর (র.) মাজার এবং এর সংলগ্ন বিশাল দিঘি। শত শত বছর ধরে এই দিঘির উন্মুক্ত পরিবেশে বংশানুক্রমে বসবাস করে আসছিল ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামের বিখ্যাত মিঠা পানির কুমির যুগল, যা মাজার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তবে কালক্রমে ২০০৬ সালে কালা পাহাড় এবং ২০১৫ সালে ধলা পাহাড়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খান জাহান আমলের আদি কুমির বংশের ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তীতে মিঠা পানির কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা কুমির দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আদি কুমিরদের মতো শান্ত স্বভাবের না হয়ে মাদ্রাজি প্রজাতির এই কুমিরগুলো হিংস্র আচরণ শুরু করে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি কুমির মারা যাওয়ার পর সম্প্রতি দিঘিটিতে মাত্র একটি কুমির অবশিষ্ট ছিল।
ঐতিহ্যবাহী দিঘির সর্বশেষ এই কুমিরটি সম্প্রতি এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে। গত সোমবার (১ জুন) রাত ৮টার দিকে মাজার সংলগ্ন দিঘিতে গোসল করতে নামে ফাতেমা আক্তার নামের সাত বছর বয়সী এক শিশু। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিঘির শেষ কুমিরটি আকস্মিকভাবে শিশুটির ওপর হামলা চালায় এবং তার পা ধরে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে মঙ্গলবার ভোরে দিঘির মহিলা ঘাট এলাকা থেকে ওই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনার পর মাজার এলাকায় আসা দেশি-বিদেশি ভক্ত, দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। জননিরাপত্তার স্বার্থে তারা দিঘি থেকে কুমিরটিকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জোর দাবি জানান। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় দিঘির শেষ কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুধবার (৩ জুন) খুলনা থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল বাগেরহাটে আসে। এই বিশেষ দলটি কুমিরটির আচরণ ও অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে কুমিরটিকে স্থানান্তর করেছে। এর মাধ্যমে শত শত বছর পর খান জাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক এই দিঘিটি সাময়িকভাবে পুরোপুরি কুমিরশূন্য হলো।
