মাদারীপুর সদর উপজেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ‘গায়েবি’ বিকাশ নম্বরে ভাতার টাকা তুলে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ এক যুগ লড়াইয়ের পর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী আরিফা আক্তার গত বছর সুবর্ণ নাগরিক কার্ড পেলেও ভাতার জন্য অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারে, ভুয়া এক ব্যক্তি তার পরিচয় ব্যবহার করে ভাতার টাকা তুলে নিচ্ছে। এ বিষয়ে সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং সমাজসেবা কার্যালয়ে দুই দফা আবেদন জানানোর ছয় মাস পরও এখনো ওই ভুয়া ব্যক্তিই ভাতা পাচ্ছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে পার্শ্ববর্তী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শাকিল হাওলাদারের ক্ষেত্রেও। প্রতিবন্ধী কার্ড পেলেও শাকিল কোনো ভাতা পায়নি, বরং তার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে রূপা আক্তার নামের এক নারী ভাতার টাকা ভোগ করছেন। শাকিলের বাবা জানান, তাঁর তিন ছেটেই প্রতিবন্ধী। বিষয়টি সরকারি অফিস ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বারবার জানানো হলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উপজেলার কালিকাপুর, তাঁতিবাড়ি, মস্তফাপুর ও পাঁচখোলা এলাকাসহ অন্তত শতাধিক ভাতাপ্রত্যাশীর ভাতার টাকা মাঝেমধ্যেই গায়েবি নম্বরে চলে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মীরা কৌশলে নম্বর পরিবর্তন করে তাঁদের পছন্দমতো বিকাশ নম্বর বসিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তবে সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বি এম আসাদুজ্জামান এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, আধুনিক নিয়মে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু জীবিতরাই নন, মৃত ব্যক্তিদের নামেও বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা অলৌকিকভাবে বিকাশ নম্বর পরিবর্তন হয়ে চলে যাচ্ছে অন্য ব্যক্তিদের কাছে। ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যাওয়া প্রতিবন্ধী আ. রশিদ হাওলাদারের ৩ মাসের ভাতার টাকা বন্ধ না হয়ে চলে যাচ্ছে এচমোতারা নামের এক স্বাভাবিক ও সচ্ছল নারীর বিকাশ নম্বরে। নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর তিন মাস পর ভাতা বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও অনৈতিক চুক্তির বিনিময়ে এই নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একইভাবে চার বছর আগে মারা যাওয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী গোলাম মওলা মুন্সির বিকাশ নম্বর পরিবর্তন হয়ে এখন নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী। গোলাম মওলার স্ত্রী এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে সদর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের নতুন নিয়মের ফাঁদে পড়ে সর্বশেষ কিস্তির (জানুয়ারি-মার্চ) ভাতার টাকা পাননি উপজেলার ৬ হাজার ২০০ জন ভাতাভোগীর একটি বড় অংশ। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী উপকারভোগীরা নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নতুন সিমকার্ড কিনে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুললেও, সমাজসেবা কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে বন্ধ থাকা পুরোনো নম্বর দিয়ে পে-রোল পাঠিয়ে দেন। ফলে চম্পা বেগম, সেলিনা আক্তারসহ বহু প্রতিবন্ধী পরিবার অর্থসংকটে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
অন্যদিকে, শারীরিক প্রতিবন্ধী মাকসুদা বেগমের মা-বাবার নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে তালিকায় থাকা এসমোতারা নামের এক নারীর ভাতার টাকা চলে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর এলাকার আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিকাশ নম্বরে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার মোট ৬০টি গায়েবি মুঠোফোন নম্বরে এভাবে নিয়মিত ভাতার টাকা চলে যাচ্ছে।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও তৎকালীন সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা উজ্জ্বল মুনশির বিরুদ্ধে কৌশলে প্রতিবন্ধীদের ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ১৭ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তাঁকে কেবল শাস্তিস্বরূপ মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে বদলি করা হয়, কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মাদারীপুর সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক বিশ্বজিৎ বৈদ্য জানান, তৎকালীন অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট ইতিমধ্যে সদর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে টাকা যেন অন্য নম্বরে না যায় সে চেষ্টা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার এ বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রতিবন্ধীদের ভাতার টাকা নিয়ে কোনো নয়ছয় মেনে নেওয়া হবে না এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
