বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যন্ত প্রতাপশালী কর্মকর্তা হয়ে উঠেছিলেন মো. খুরশীদ আলম। এই কর্মকর্তাকে নিজ বিভাগের মানুষ হিসেবে ব্যাংক লুটের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেই লুফে নেন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম)। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে নানা অনিয়মের পথ বের করে সেই অনুযায়ী এস আলমকে চলার পরামর্শ দিতেন খুরশীদ আলম, এমনকি ব্যাংক ঋণ বাগিয়ে নেওয়ার সকল কূটকৌশলও তিনি বাতলে দিতেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবেদনশীল একাধিক বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুবাদে অর্জিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খুরশীদ আলম এস আলমকে ঋণ অনিয়মে সহযোগিতার জন্য একটি বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালে এস আলমের ইসলামী ব্যাংকসহ ৭টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জবরদখলের মাধ্যমে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে খুরশীদ আলমের পরামর্শ ছিল অন্যতম নিয়ামক। যার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলম ডেপুটি গভর্নর এবং সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীরের সময় থেকেই খুরশীদ আলম ব্যাংকটির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন এবং তার মৌখিক নির্দেশেই পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন চলত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের লোকদের জন্য বাড়তি অগ্রাধিকার থাকায় তার সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা সব কর্মকর্তা কোণঠাসা ছিলেন। এই সিন্ডিকেট বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিস এবং টার্গেটেড বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অঘোষিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। মূলত এস আলমের ক্ষমতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন এই খুরশীদ আলম।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুরশীদ আলম ডেপুটি গভর্নর হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এস আলমের ব্যাংক লুটের সহচর থাকার দায়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে গত আগস্টে তিনি পদচ্যুত হন। তবে এই কর্মকর্তা যে নতুন করে অনিয়ম করেছেন তা নয়, এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৮ সালে তাঁর দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বন্ধের শাস্তি হয়েছিল।
অনিয়মে সহযোগিতার প্রতিদান হিসেবে খুরশীদ আলমের স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকার ঋণ উপহারের ব্যবস্থা করেছিলেন এস আলম। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এস আলম ২০১৬ সালে ধানমন্ডির একটি অস্তিত্বহীন ও ভুয়া ঠিকানায় ‘এগ্রোক্রপ লিমিটেড’ নামের কোম্পানির বিপরীতে খুরশীদ আলমের স্ত্রী আফরোজা আক্তারকে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঋণ দেন, যা আজও শোধ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিবেদনেও এই খেলাপি ঋণের তথ্য উঠে এসেছে।
গত ২৪ মে বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান খুরশীদ আলমকে দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন। তবে ব্যাংক লুটেরা এস আলমের পরামর্শক এবং পতিত সরকারের দোসর হওয়ার কারণে খুরশীদ আলমের এই নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ব্যাংকটির গ্রাহকরা তীব্র আন্দোলন চলমান রেখেছেন। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে, যার ফলে ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিকভাবে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাগুজে বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের (শেল কোম্পানি) নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে মূলত ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালে ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর গ্রুপটি নিজেদের মালিকানা ব্যবহার করে আরও ব্যাপক ঋণ সুবিধা নিতে থাকে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট, যার মধ্যে শীর্ষে থাকা ‘এস আলম সুপার এডিবল অয়েল’-এরই খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্তের মধ্যে এস আলমের আন্তর্জাতিক সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসের একটি আদালত লিমাসসোল জেলায় অবস্থিত এস আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোকের আনুষ্ঠানিক আদেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশছাড়া হওয়া এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি ব্যাংক এখন বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি পরিচালনা করছে।
