সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটি ভুয়া বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ৮১ ব্যাচের সাবেক এই সচিব মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে তিনি ভারতে পালিয়ে আছেন। ১৯৮৫ সালে চাঁপিনাভাবগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে নিরীহ জনতার ওপর গুলি চালানোর আদেশ দিয়েও তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন।
মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের মতো বাংলাদেশে এমন হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা ভোগ করছেন। গাণিতিক নিয়ম অনুযায়ী বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমার কথা থাকলেও বাংলাদেশে দিন দিন এই তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সূত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে আরও প্রায় দেড় হাজার নতুন আবেদন জমা পড়েছে, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বেকায়দায় ফেলেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিক তালিকায় ৭৮ হাজার ৯৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল। এরপর বিভিন্ন সরকারের আমলে এই সংখ্যা ওঠানামা করেছে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা বেড়েছে। ৫৩ বছরে দেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বেড়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৩৯ জন।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় সুবিধা, মাসিক ভাতা এবং সামাজিক প্রভাব বজায় রাখার জন্য অনেকেই ভুয়া ছবি বা ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ‘শরনার্থী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে আবেদন করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জামুকায় এমন ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, যার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সাল থেকে মাঠপর্যায়ে শুনানি শুরু হয়। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর জালিয়াতির অভিযোগে ৭১ জনের গেজেট বাতিল করা হয় এবং বয়স কম হওয়ায় (১২ বছর ৬ মাসের নিচে) আরও ২,১১১ জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে। জামুকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬,৪৭৬ জনের সনদ বাতিল হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা ৮৯,২৩৫ জন। গেজেট বাতিল ও বয়সসীমা নির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বর্তমানে ২,৭১৯টি মামলা চলমান রয়েছে। জামুকার পরিচালক উপ-সচিব মোহাম্মদ উল্যাহ জানান, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের শুনানি ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এই ৭৯ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তদন্ত শেষ করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত গণশুনানির পাশাপাশি আদালতে চলমান মামলাগুলোরও দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে গিয়ে যেন কোনো প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদ না পড়েন, সে বিষয়ে জামুকা ও সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
