প্রায় ছয় বছর পর কোনো তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্বাগত জানান। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
এই সফরকে তুরস্কের বৃহত্তর ‘এশিয়া অ্যানিউ’ কৌশলের সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আঙ্কারা গত কয়েক বছর ধরে এই নীতির মাধ্যমে এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন স্রেফ ক্রেতা-বিক্রেতার গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত রূপ নিতে শুরু করেছে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও ঢাকা ও আঙ্কারার সামরিক সহযোগিতা কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ড্রোন উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যৌথ উৎপাদন কারখানা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নানা বিষয়ে আলোচনা চলছে।
১৯৭৪ সালে ওআইসি বৈঠকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ডি-৮ এর সদস্য। আওয়ামী সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা তৈরি হলেও, বর্তমানে সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সম্পর্ক আবার আগের মজবুত ভিত্তিতে ফিরে এসেছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্ক বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে গিয়ে সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে চায় ঢাকা। সীমান্তের ওপারে ‘প্রভুর বদলে বন্ধু’ খোঁজার যে বার্তা বাংলাদেশের নতুন সরকার দিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো ঔপনিবেশিক অতীত না থাকা তুরস্কের সঙ্গে তা দারুণভাবে মানিয়ে যায়।
হাকান ফিদানের এই সফরে দুই দেশ প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্বাস্থ্য খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে একমত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের সরকার একটি সাংস্কৃতিক সহযোগিতা স্মারকেও সই করেছে, যা মূলত দুই দেশের মানুষ ও সভ্যতাকেন্দ্রিক গভীর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিরক্ষা খাতে আঙ্কারা স্পষ্ট করেছে যে তারা শুধু সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং বাংলাদেশে যৌথ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে আগ্রহী। তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত তাঁর আগের সফরে বাংলাদেশে একটি ‘প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল’ গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে দ্রুত ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি ওষুধ এবং হাসপাতাল অবকাঠামো খাতেও তুর্কি বিনিয়োগকারীদের উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তান ও চীন। এই দেশগুলো কোনো সমন্বিত জোট হিসেবে কাজ না করলেও বাংলাদেশে তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ ক্রমবর্ধমানভাবে একই দিকে নির্দেশ করছে। তবে বাংলাদেশের এই নতুন মেরুকরণ ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়টি প্রতিবেশী ভারত বেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
দুই দেশের এই নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ হলো চুক্তিগুলোর সফল বাস্তবায়ন। একটি প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য শুল্ক আলোচনা, ভূমি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জটিল শর্তাবলি পূরণ করা জরুরি। এছাড়া যেকোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও যেন এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব বজায় থাকে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
