রাশিয়ায় গত মে (২০২৬) মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে একাধিক মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় প্রতিনিধি গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে এসব খবর সীমিত আকারে প্রচার হলেও, অনলাইনে এ নিয়ে নানা বিতর্ক ও ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা সামনে এসেছে।
উগ্র-ডানপন্থি সংগঠনগুলোর কাছে এই গ্রেপ্তার ছিল ক্রেমলিন-সমর্থিত ‘স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস’ (ডিইউএম) ভেঙে দেওয়ার অভিযানের সূচনা। অন্যদিকে, নির্বাসিত ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, এটি রাশিয়ায় ইসলামবিদ্বেষ এবং অভিবাসীবিরোধী মনোভাব বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কারা আটক হয়েছেন? ২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত আটজন মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি প্রতিনিধিকে আটক করে। তাদের মধ্যে কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিলকে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে ‘পুলিশের সঙ্গে অবাধ্যতা’র অভিযোগে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া এফএসবি কর্তৃক আটক হন বার্দভিলের ডেপুটি আখমাদ তাঙ্গিয়েভ। অন্যদিকে, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকে ‘ঘুষ চাওয়ার’ সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। সেন্ট পিটার্সবার্গে আটক হন কেন্দ্রীয় ধর্মীয় সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনি এবং সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদ।
আটকের নেপথ্য কারণ ও গুরুতর অভিযোগ আটক আলেমদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ‘ঘুষ’ থেকে ‘অবাধ্যতা’র অভিযোগ আনা হলেও, তদন্ত নথির বরাত দিয়ে গণমাধ্যম ‘কোমেরসান্ত’ জানায়, অনেকের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কট্টর প্রচারকরা এই আলেমদের “পঞ্চম স্তম্ভ” বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন। উগ্র-ডানপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী ব্লগাররা এই গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানিয়ে একে রাশিয়ার ‘হালালাইজেশন’ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন ও চিত্রকর্ম বিতর্ক মুসলিম আলেমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি হয় ডিইউএম-এর প্রথম ডেপুটি দামির মুখেতদিনভের বিরুদ্ধে। তাঁর কার্যালয়ে ১২২৩ সালের ‘কালকা যুদ্ধ’ (মঙ্গোলদের প্রথম রাশিয়া আক্রমণের ঐতিহাসিক মোড়) চিত্রিত একটি চিত্রকর্ম ঝুলিয়ে রাখার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগ আনা হয় এবং জরিমানা করা হয়।
কট্টর জাতীয়তাবাদীরা এটিকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ আখ্যা দিলে মুখেতদিনভ প্রথমে গোল্ডেন হোর্ডের ঐতিহাসিক অবদানের কথা বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। তবে তীব্র বিতর্কের মুখে পরে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে চিত্রকর্মটি সরিয়ে নেন এবং সেখানে নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের চিত্রকর্ম স্থাপনের ঘোষণা দেন।
নীরবতা ভেঙে ডিইউএম প্রধানের বক্তব্য আলেমদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম) দীর্ঘদিন প্রায় নীরব ছিল। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো প্রথমে একে “গণগ্রেপ্তার নয়” বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
অবশেষে ৮ই জুন ডিইউএম প্রধান রাভিল গাইনুতদিন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন, “ডিইউএম-কে চরমপন্থা, উগ্রবাদ বা বিদেশি প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত বলে যে দাবি করা হচ্ছে, আমরা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।” তবে তিনি তাঁর বিবৃতিতে গ্রেপ্তার বা আটকের সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ করেননি।
নামাজ নিষিদ্ধের বিতর্কিত বিল ও দমন পীড়ন মে মাসের শুরুতে রাভিল গাইনুতদিন আবাসিক ভবনে বা অ্যাপার্টমেন্টে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত বিলের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। শাসক দলের শীর্ষ নেতাদের সমর্থনে তৈরি এই বিলটি পাস হলে আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে নামাজ পড়লেও তা আইন লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে।
গাইনুতদিন সতর্ক করেন, মুসলমানদের জন্য পর্যাপ্ত মসজিদ না দিয়ে এমন নিষেধাজ্ঞা চরমপন্থা উসকে দেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবাদপত্র এবং সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের ঢেউয়ের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সাল থেকেই রাশিয়ার বিভিন্ন উপাসনালয়ে ‘অভিবাসীবিরোধী’ অভিযানের নামে মুসলিমদের ধরে সরাসরি সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের নজির রয়েছে।
ক্রেমলিন ও মুসলিম নাগরিকদের জটিল সম্পর্ক রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের মধ্যে বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। প্রেসিডেন্ট পুতিন ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে (যেমন সৌদি আরবের সাথে আলোচনা বা অর্থনৈতিক ফোরামে) এই মুসলিম পরিচিতিকে ব্যবহার করলেও, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ‘অর্থোডক্স রাশিয়া’ বা স্লাভিক ঐতিহ্যের একক ধারণাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেমলিনকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া সত্ত্বেও এই গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, রাশিয়ায় ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সমীকরণটি দিন দিন আরও জটিল ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
