বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ভারত শুধু একটি সামরিক ক্রয় হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক গণমাধ্যম ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা গতি পায়। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করা হচ্ছে। বর্তমানে বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের বিকল্প হিসেবে আধুনিক সক্ষমতার জেট প্রয়োজন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
চুক্তির আওতায় শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জানা গেছে, আগামী ১০ বছরে সহজ কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকায় জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক বড় চাপ পড়বে না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশে সরবরাহ করা হতে পারে। এর মাধ্যমে বিমান বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ভারতের প্রতিরক্ষা মহলেও আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করা শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন দেশটির কিছু কৌশলগত বিশ্লেষক।
ভারতীয় সামরিক মহলের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় ঘাঁটিতে উন্নতমানের যুদ্ধবিমান মোতায়েন হলে তা ভারতের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এর আগে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহানও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
জে-১০সিইকে চীনের অন্যতম আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে অত্যাধুনিক অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, উন্নত ডেটা লিংক ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিমান একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সক্ষম। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই চীন থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাবমেরিন, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজের পর এবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত হওয়ায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও আকাশসীমা সুরক্ষার প্রয়োজনেই আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ শুধু বিমান বাহিনীর সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত ভারসাম্যেও নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর ফলে অঞ্চলটি আরও প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তা বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
