প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট এবং স্ক্রিন রেকর্ড সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট বলে তথ্য পাওয়া গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থী একটি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট চক্র ব্রাউজারের কোড পরিবর্তন করে এই ভুয়া প্রমাণ তৈরি করেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
গত ১৭ জুন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) পরিদর্শনে গিয়ে ফুটবল শট নেওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন জাইমা রহমান, যা দ্রুত ভাইরাল হয়। এর তিন দিন পর, ২০ জুন ‘Ryan Draper’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দাবি করা হয়, ‘Sabidul Islam Siam’ নামের এক কিশোরের আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যসহ ছবিটি পোস্ট করা হয়েছে। এই স্ক্রিনশটটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানায় দুটি পৃথক অভিযোগ দায়ের হলে পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সিয়ামকে আটক করে এবং পূর্বের একটি মামলায় তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়।
স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ডের বিশ্বস্ততা নিয়ে বড় প্রশ্ন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবিদুল ইসলাম সিয়ামের আইডি থেকে জাইমা রহমানের ছবিসহ কুৎসিত মন্তব্যের যে স্ক্রিনশট ছড়ানো হয়েছে, সেটির একমাত্র উৎস Ryan Draper-এর আইডি। পুরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর দ্বিতীয় কোনো ভার্সন বা আর্কাইভ খুঁজে পাওয়া যায়নি। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্ট চেকার সোহানুর রহমান প্রথম এই স্ক্রিনশটের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একদিন ধরে বহাল থাকা একটি বিতর্কিত ভাইরাল পোস্টের মাত্র একটিই স্ক্রিনশট কেন সবাই শেয়ার করছেন? এছাড়া, এই চক্রটির অতীতেও জাইমা রহমানকে নিয়ে একই রকম ভুয়া স্ক্রিনশট ছড়ানোর রেকর্ড রয়েছে।
ফ্যাক্ট চেকাররা সন্দেহ প্রকাশ করার পর, Ryan Draper তার দাবির সপক্ষে সিয়ামের ফেসবুক প্রোফাইলের একটি ৫৭ সেকেন্ডের স্ক্রিন রেকর্ড (ভিডিও) প্রকাশ করে। তবে এই ভিডিওটিই মূলত পোস্টটি যে সম্পূর্ণ ভুয়া, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে।
যেভাবে ওয়েবপেইজের কোড পরিবর্তন করে জালিয়াতি করা হলো
ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সিয়ামের আইডির টাইমলাইন স্ক্রল করার সময় জাইমা সংক্রান্ত কথিত পোস্টটি দেখা গেলেও, বামপাশের ‘Photos’ সেকশনে সেই ছবির কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত, ১৮ জুন সকালে সিয়াম একটি ভিন্ন ফেসবুক পেজের পোস্ট নিজের ওয়ালে শেয়ার করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘আনএভেইলেবল’ বা মুছে ফেলা হয়। Ryan Draper নিজের ব্রাউজারের ডেভেলপার টুল “ইন্সপেক্ট এলিমেন্ট” (Inspect Element) ব্যবহার করে সিয়ামের প্রোফাইলের সেই নির্দিষ্ট পোস্টের এইচটিএমএল (HTML) ও সিএসএস (CSS) কোড লোকালি পরিবর্তন করেন। এরপর সেখানে জাইমা রহমানের ছবি ও অশ্লীল ক্যাপশন বসিয়ে পুরো প্রোফাইলের স্ক্রিন রেকর্ড নেন।
এই জালিয়াতির আরেকটি বড় প্রমাণ মিলেছে সময়ের তারতম্যে। যে কম্পিউটার থেকে স্ক্রিন রেকর্ডটি করা হয়েছে, সেটির টাইম জোন বাংলাদেশ থেকে ১৩ ঘণ্টা পিছিয়ে ছিল। ফলে সিয়ামের আসল প্রোফাইলে থাকা ১৮ জুনের পোস্টটি ভিডিওতে ১৭ জুন দেখাচ্ছিল। আরও বড় অসঙ্গতি হলো, Ryan Draper-এর প্রথম দেওয়া স্ক্রিনশটে পোস্টের নিচে দুটি কমেন্ট ও তিন ধরনের ইমোটিকন (লাভ, কেয়ার, লাইক) দেখা গেলেও, ভিডিও রেকর্ডে কোনো কমেন্ট ছিল না এবং ইমোটিকনের সিরিয়ালও সম্পূর্ণ ভিন্ন (অ্যাংরি, কেয়ার, লাভ) ছিল। এই রিয়্যাকশনগুলো মূলত ১৮ জুন সিয়ামের শেয়ার করা আসল পোস্টটির রিয়্যাকশনের সাথে হুবহু মিলে যায়।
সিয়ামের দাবি এবং একই চক্রের অতীত অপকর্মের ইতিহাস
আটক হওয়ার আগে সিয়াম তার নিজের প্রোফাইলে এক পোস্টে এই প্রচারণাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও এডিট করা বলে দাবি করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার সম্মানহানি ও সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে সিয়ামের আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে কিছু ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যা হয়তো তাকে টার্গেট করার অন্যতম কারণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, এই একই অনলাইন নেটওয়ার্কের আইডিগুলো (যেমন- LE O, Aronno Abir) গত ২৩ এপ্রিলও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাইমা রহমানকে জড়িয়ে একটি কুরুচিপূর্ণ এআই জেনারেটেড ছবি ও ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরি করে ডাকসুর এক শিবির নেতার নামে চালিয়ে দিয়েছিল, যা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে। এই আইডিগুলো মূলত আওয়ামী লীগের সাইবার ফোর্স ‘‘ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ’’-এর হয়ে কাজ করে এবং এদের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের আইডি ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে ডাউন করার প্রমাণ ও কৃতিত্ব দাবির ইতিহাস রয়েছে।
