সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা জৈব সারের বস্তায় মাটি, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের এই ভেজাল সার নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা কেবল গাছের চারা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চত্বরে সরকারি সার ও চারা বিতরণের সময় এ নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, পাঁচ বছর মেয়াদি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তার আওতায় এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অধীনে উপজেলার ২০০ জন কৃষক ও ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে আম, জলপাই, নিম ও মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ চারা এবং ৩০ জন কৃষককে লেবুর চারা দেওয়ার কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি চারার পরিচর্যার জন্য ৩০ কেজি করে জৈব সার এবং চারা সোজা রাখার জন্য আস্ত বাঁশের খুঁটি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, সারের বস্তা খুলে তারা কেবল পলিথিন ও প্লাস্টিক আবর্জনার মিশ্রণ দেখতে পান। এছাড়া তাদের অত্যন্ত ছোট ও নিম্নমানের চারা দেওয়া হয়েছে এবং আস্ত বাঁশের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে নামমাত্র বাঁশের ফালি।
ভেজাল সার পেয়ে উপজেলা চত্বরেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপস্থিত সুবিধাভোগী কৃষকরা। বাড়াকান্দি গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, জৈব সারের নামে বস্তায় ময়লা-আবর্জনা ও মাটি ভরে তাদের সঙ্গে সরকারি সহায়তার নামে প্রতারণা করা হয়েছে। তাই তিনি বর্জ্য মিশ্রিত সার না নিয়ে কেবল চারা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। রঞ্জু নামের অপর এক কৃষক জানান, অতীতে কৃষি অফিস থেকে ভালো মানের সার দেওয়া হলেও এবারের সার কোনোভাবেই জমিতে ব্যবহারের উপযোগী নয়, এটি ব্যবহারে উল্টো ফসলের ক্ষতি হবে। উপস্থিত একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাও সারের এমন বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং স্বীকার করেন যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ মানহীন ও কৃষিকাজের অনুপযোগী সার নিয়ে এসেছে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক একরামুল কবির অভিযোগ তোলার পর স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। তিনি জানান, সরকারি প্রকল্পে এমন হরিলুট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে কামারখন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রতন চন্দ্র বর্মন বলেন, যেসব বস্তায় নিম্নমানের ও ভেজাল সার পাওয়া গেছে, সেগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত পাঠানো হবে। তবে কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই সার সরবরাহের দায়িত্বে ছিল, সে বিষয়ে তিনি রহস্যজনকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে কামারখন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপাশা হোসাইন জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সরবরাহকারীকে ভেজাল সার ফেরত দিয়ে দ্রুত মানসম্মত জৈব সার বিতরণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কারও গাফিলতি বা দুর্নীতি প্রমাণ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুরে মাওলা পুরো জেলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, কামারখন্দসহ সিরাজগঞ্জে মোট ১৪ হাজার ৬৫০ জন কৃষককে চারা ও জৈব সার দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকারি বরাদ্দে জনপ্রতি ৩০ কেজি সারের জন্য মাত্র ১২০ টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজি সারের মূল্য পড়ছে মাত্র চার টাকা, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে মানসম্মত জৈব সার সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। কামারখন্দের সারের নিম্নমানের বিষয়টি ইউএনও তাকে অবহিত করেছেন এবং সরবরাহকারীকে ওই সার পরিবর্তন করে নতুন সার দিতে বলা হয়েছে, যা সম্পন্ন হতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।
