বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, অন্যায়, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান সবসময়ই আপসহীন। তিনি বলেন, “নতুন-পুরাতন বুঝি না, যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।”
শুক্রবার সকালে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার পুরুষ ও মহিলা সদস্যরা অংশ নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় দল আপসহীন থাকবে। তিনি দাবি করেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন ও সংস্কার পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ দুটি বিষয়ে মত দিলেও একটি বিষয়ে সেই মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। তাঁর ভাষায়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের মতামত উপেক্ষিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক সংস্কার চাইলেও সরকার তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেনি। স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জুলাই সনদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে ৩১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে প্রণীত ওই সনদের ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও জনগণের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে হবে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য থাকা জরুরি। সীমান্তে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজিবির পাশে দেশের জনগণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, সুশিক্ষা বিস্তার এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের সততা ও জবাবদিহিতার ওপরই দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগোতে শুরু করেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে ও বাইরে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি শিশু ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বক্তব্যের শেষাংশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানবিক, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামী কাজ করে যাবে। শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
