খুলনার পাইকগাছায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও ওই শিক্ষক এখনো বহাল তবিয়তে চাকরিতে থাকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া নবারুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার মূলত ভারতেরও নাগরিক। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নং বরশুল গ্রামের ১ নং মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের বাসিন্দা হিসেবে সেখানকার ভোটার। অথচ তিনি একই সাথে পাইকগাছার খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামেরও ভোটার।
শুধু তিনিই নন, তাঁর স্ত্রী অপর্ণা সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার ও তাঁর স্ত্রী সুশীলা সরকার এবং ছোট ভাই তাপস সরকার ও তাঁর স্ত্রী বর্ণালী সরকারও ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা ও নিবন্ধিত ভোটার। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীপক চন্দ্র সরকার তাঁর পরিবারের সব সদস্যকে পাকাপাকিভাবে ভারতে পাঠিয়ে দিলেও নিজে বাংলাদেশে থেকে বিদ্যালয়কে পুঁজি করে দেদারসে অবৈধ অর্থবিত্ত তৈরি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্বজনপ্রীতি ও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে ২০২৪ সালে বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী ও আয়া নিয়োগ দেন এই প্রধান শিক্ষক। এই নিয়োগ বাণিজ্যে অন্তত ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ ওঠে। গোপনে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়টি জানাজানি হলে গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল, সমাবেশ এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।
এছাড়া, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে বিদ্যালয়ে প্রণোদনা অনুদান বাবদ বরাদ্দকৃত ৫ লাখ টাকা খরচের ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। বরাদ্দের মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা শিক্ষক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যয় করা হলেও বাকি ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের সংস্কার ও সামগ্রী কেনাকাটার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয় বলে সরকারি তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার জানান, প্রধান শিক্ষক স্কুলের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভারতে পাচার করছেন, কিন্তু দফায় দফায় অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল মিলছে না।
নথিপত্র অনুযায়ী, এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলা রিসোর্স অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং জেলা শিক্ষা অফিসার পৃথক তিনটি তদন্ত পরিচালনা করে অভিযোগের সত্যতা পান। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি খুলনা জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরিত এক প্রতিবেদনে পাইকগাছার ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিতর্কিত।
ইউএনও’র এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর এই বিষয়ে গত চার মাসেও মাউশির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দ্বৈত নাগরিকত্ব ও দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার। তিনি দাবি করেন, “আমি ভারতের ভোটার নই, আমি বাংলাদেশেরই নাগরিক। বিদ্যালয়ে অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্যের যেসব কথা বলা হচ্ছে, তার কোনোটিই সত্য নয়।”
