উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বর্তমানে যে রাম মন্দিরটি রয়েছে, সেই স্থানেই একসময় দাঁড়িয়ে ছিল ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালে হিন্দু উগ্রপন্থীদের হাতে মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় সারা ভারতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সহিংসতায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম।
বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে বিজেপি-সমর্থিত হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। বহু হিন্দুর বিশ্বাস, অযোধ্যার এই স্থানই ভগবান রামের জন্মস্থান।
তবে দীর্ঘ বিতর্কের পর ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই মন্দির এখন বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। গত এক মাস ধরে অভিযোগ উঠেছে, ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদান ও মূল্যবান উপহার আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।
ভক্ত ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, যারা ধর্মের নামে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারাই সেই বিশ্বাসকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে।
রাম মন্দির উদ্বোধনের পর এটি ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মন্দিরটি পরিচালনা করে স্বাধীন সংস্থা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’। যদিও ট্রাস্টটি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, তবে এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।
চলতি মাসে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। যদিও এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও আল জাজিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
এদিকে সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেছেন, মন্দিরের অনুদানের কোটি কোটি রুপি গায়েব হয়ে গেছে। বিরোধীদের চাপের মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশ ইতোমধ্যে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে অনুদানের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন ব্যক্তিও রয়েছেন।
এ ছাড়া অনেক ভক্ত অভিযোগ করেছেন, তারা ট্রাস্টের কাছে জমা দেওয়া রুপার ইট, স্বর্ণালংকার এবং অন্যান্য মূল্যবান উপহারের কোনো হিসাব পাচ্ছেন না।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ কয়েকজন প্রভাবশালী ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে চম্পত রায়ের পদত্যাগ ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে পদত্যাগের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হাজারো ভক্তের পাশাপাশি বিজেপির একাংশের সমর্থকরাও নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং অনুদানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
সূত্র: আল জাজিরা
