জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল রাজপথের ছাত্র-জনতার সাহসিকতার গল্প নয়, এই লড়াইয়ে সমান গুরুত্ব ও মর্যাদার দাবিদার এ দেশের নারীরাও। স্বৈরাচার দমনের এই মহাকাব্যে নারীরা কখনো ছিলেন মিছিলের একদম সম্মুখভাগে, কখনো বুলেটের আঘাতে আহতদের সেবায়, আবার কখনো তথ্যপ্রবাহের সম্মুখ সমরে। অনেকে নিজ ফ্ল্যাটের বারান্দা কিংবা ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের সাহস ও শক্তি জুগিয়েছেন। ফ্যাসিস্ট শক্তির নির্মম বুলেট থেকে রেহাই পাননি তাঁরাও।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের তালিকায় ১০ জন নারী ও শিশু রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী, দুজন কর্মজীবী, দুজন গৃহবধূ এবং একজন গৃহকর্মী। ফ্যাসিবাদের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে এই বীর কন্যারা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লিখে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের এক নতুন অবিনশ্বর ইতিহাস।
বারান্দার রক্তে মিশে যাওয়া স্বপ্ন
রাজধানীর উত্তরায় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায় কিশোরী নাঈমা সুলতানা। ১৯ জুলাই বাসার বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড় আনতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। অথচ পাঁচদিন পরই ছিল তার জন্মদিন। জন্মদিনের কেকের বদলে পরিবারে আসে কফিন। মা জানান, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা মেয়ের শেষ উক্তি ছিল ‘মা’।
অনুরূপ এক ট্র্যাজেডির শিকার হন ২০ বছরের সুমাইয়া আক্তার। ২০ জুলাই বিকেলে সংঘর্ষের শব্দ শুনে বারান্দা দিয়ে পরিস্থিতি দেখতে গেলে গ্রিল ভেদ করে আসা একটি বুলেট তাঁর মাথা ঝাঁঝরা করে দেয়। রক্তাক্ত সুমাইয়া চিরবিদায় নেন তাঁর মাত্র আড়াই মাসের কোলের শিশুকে রেখে।
বাবার কোলে ও দাদির আঁচলে নিভে যাওয়া প্রাণ
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী শহীদ সাড়ে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপ। ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে বাসার ছাদে খেলার সময় গোলাগুলির শব্দ শুনে বাবা তাকে কোলে নিয়ে নিচে নামতে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি গুলি এসে রিয়ার মাথায় লাগে এবং বাবার কোলেই সে ঢলে পড়ে। কয়েক দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বিদায় নেয় ছোট্ট রিয়া।
অন্যদিকে, ১৯ জুলাই দুপুরে নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেন ৬০ বছর বয়সী দাদি মায়া ইসলাম। ৭ বছরের নাতি মুসাকে নিয়ে বাসার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় একটি বুলেটের গতিপথ নাতির মাথা ভেদ করে মায়ার তলপেটে গিয়ে ঢোকে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাতি বেঁচে গেলেও দাদি হার মানেন মৃত্যুর কাছে।
রাজপথের অকুতোভয় বীর ও অসমাপ্ত স্বপ্ন
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ১৭ বছরের নাফিসা হোসেন মারওয়া শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় ছিল। ৫ আগস্ট দুপুরে বাবাকে ফোন করে বলেছিল, ‘আব্বু, হাসিনা পলাইছে।’ কিন্তু সাভারে বিজয় মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার স্বপ্ন চিরতরে থেমে যায়।
রিকশাচালক বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়ে রিতা আক্তার ডাক্তার হবে। মিরপুরের একটি সরকারি কলেজের বিজ্ঞপ্তির এই শিক্ষার্থী ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দেয়। গভীর রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া রিতার নিথর দেহ খুঁজে পান তার মা। মাটিচাপা পড়ে যায় এক দরিদ্র পরিবারের বহু বছরের লালিত স্বপ্ন।
মামাতো ভাই রাব্বির হত্যার প্রতিশোধ ও প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিদিন রাজপথে দাঁড়াতেন মেহেরুন নেছা তানহা (২২)। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে জানালার সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় একটি আচমকা গুলিতে প্রাণ হারান এই সাহসী তরুণী।
সংসার ও জীবনের লড়াইয়ে থাকা সাধারণের আত্মত্যাগ
পাঁচ সন্তান আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীর একমাত্র উপার্জনক্ষম মা শাহিনূর বেগম মাছের ব্যবসা করতেন। ২২ জুলাই ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বেরিয়ে কাজলা সেতুর কাছে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘ ১ মাস ৯ দিন আইসিইউতে লড়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ নিরুপায়।
ভোলার দরিদ্র পরিবার থেকে জীবিকার খোঁজে আসা মোসা. লিজা আক্তার শান্তিনগরের একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। ১৮ জুলাই বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে বারান্দায় দাঁড়ানো মাত্রই একটি বুলেট তার মাথায় এসে বিদ্ধ হয়। ২২ জুলাই মারা যান এই স্বপ্নহীন সাধারণ কর্মজীবী নারী।
নোয়াখালী থেকে বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসে ১৯ জুলাই সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার একটি ছাদে বুলেটের শিকার হন নাছিমা আক্তার। তার গলা ভেদ করে চলে যাওয়া বুলেটের আঘাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরের দিন তার মৃত্যু হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই বীরকন্যাদের আত্মত্যাগ শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন করে বেঁচে ওঠার অমূল্য দলিল। শহীদদের পরিবারের দাবি—রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং এই আত্মত্যাগের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং একটি সাম্য ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা।







