বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ নামক একটি প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা উদ্যোগকে ‘বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে খোদ পাকিস্তানের নিজস্ব অডিট রিপোর্ট এবং মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই প্রকল্পটিকে একটি চরম ব্যর্থ ও বিপুল অর্থ অপচয়কারী ‘সাদা হাতি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
গত ৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভীর সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের সেফ সিটি মডেল পরিদর্শন করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শহরগুলোকে নিরাপদ করতে পাকিস্তান কারিগরি সহযোগিতা দিতে পারে।
অথচ পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডন’-এ প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই পাঞ্জাব সেফ সিটি অথরিটি (পিএসসিএ)-র ভয়াবহ অকার্যকারিতা ও নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। ৯০০ কোটি রুপিরও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটিকে ‘সাদা হাতি’ উল্লেখ করে বলা হয়, বিপুল খরচের তুলনায় এটি নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
প্রকল্পটির চরম অসারতা সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হয় ২০২২ সালে লাহোরের আনারকলি বাজারে একটি বড় বোমা হামলার সময়। সে সময় পুরো এলাকার সরকারি নজরদারি ক্যামেরাগুলো অকেজো থাকায় সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করতে তদন্তকারীরা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, লাহোরে স্থাপিত প্রায় ৮ হাজার অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে একপর্যায়ে মাত্র ২ হাজারটি সচল ছিল। এছাড়া ব্যাকআপ বা জেনারেটর সুবিধা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ৯২টি ফোরজি টাওয়ার বন্ধ হয়ে জরুরি সেবা অচল হয়ে পড়ে এবং পুলিশের কল সেন্টারের ৩৩টি সিস্টেমের হেডফোন পর্যন্ত ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকার প্রমাণ মেলে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক নজরদারি প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনি সুরক্ষা ও দক্ষ ফরেনসিক ব্যবস্থার অভাব দূর না করে কেবল বিপুল অর্থ ব্যয়ে দামি ক্যামেরা বসানো একটি অকার্যকর ব্যবস্থার ওপর ‘দামি প্রলেপ’ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে নিউইয়র্কের সেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শুধু সেফ সিটি প্রকল্পই নয়, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মন্ত্রীর মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারি ও দক্ষতা বাড়াতে পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানে পাকিস্তানের সহযোগিতা কামনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
