বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নে ক্রমেই চাপে পড়ছে ভারত। দেশটির বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, হাসিনাকে দিল্লিতে রেখে কেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা হবে। অনেকের মতে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে দুই দেশের বাণিজ্য, পর্যটন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বাংলাদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যাওয়ায় ভারতের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কলামিস্ট মহুয়া গগৈ মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশিদের মধ্যে ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হলেও পর্যটকের সংখ্যা আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্পে ভারতের ধীরগতির কারণে ঢাকা এখন বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগী হয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণকে দিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারতীয় কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেল ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতে বসেই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এসব আলোচনায় বলা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদিকে ঢাকায় পাঠানোর বিষয়টিও নানা বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় মহলের দাবি, দুই দেশের জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কিছু বক্তব্য বাংলাদেশে সমালোচনারও জন্ম দেয়।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের জন্য আর কোনো রাজনৈতিক পরিসর নেই। তার মতে, আওয়ামী লীগের উচিত নতুন বাস্তবতা মেনে সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়া।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কৌশলগত সমীকরণ ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প এবং সম্ভাব্য চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরকে দিল্লি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ভারত এখন রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আইনি—তিন ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের দাবি, অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
