তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে বুলগেরিয়ান লেখিকা সোফিয়া প্রোনাইকোস (Sophia Proneikos) এক অনন্য বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তাঁর মতে, এই সম্মেলনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি কোনো আলোচনার টেবিলে সৃষ্টি হয়নি, বরং তা তৈরি হয়েছিল আনুষ্ঠানিক বৈঠকেরও আগে, রাষ্ট্রপতির প্রাসাদের সদর দরজায়।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের নেতারা যখন তুরস্কের প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে প্রবেশ করছিলেন, তখন তাঁদের স্বাগত জানাতে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান। বিশ্বনেতারা একে একে গাড়ি থেকে নেমে যখন ফিরোজা রঙের কার্পেট ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখন কমপ্লেক্সজুড়ে বেজে উঠছিল বিশ্বের প্রাচীনতম সামরিক ব্যান্ড ‘মেহতের’-এর গম্ভীর ও অনুরণিত সুর।
সেখানে একদিকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক সামরিক পোশাকে সজ্জিত মেহতের ব্যান্ড সুর তুলছিল, অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ছিল বিভিন্ন যুগে প্রতিষ্ঠিত ১৬টি তুর্কি রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্বকারী ঐতিহাসিক পোশাকে সজ্জিত একদল সৈনিক। আধুনিক ও প্রাচীন সামরিক শক্তির এমন এক মেলবন্ধন সেখানে তৈরি হয়েছিল, যা ছিল এক অসাধারণ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি।
১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের সামরিক শক্তির প্রতীক ন্যাটো যখন আধুনিক তুরস্কের রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে প্রবেশ করছিল, তখন তাদের স্বাগত জানাচ্ছিল এমন এক সামরিক ঐতিহ্যের সুর, যার শিকড় পৌঁছে যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কিংবা তারও বহু আগে। মেহতার (Mehter) হলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সামরিক ব্যান্ড, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অটোমান সামরিক শক্তি, রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে লেখিকা দেখিয়েছেন, ‘মেহতের’ কখনোই কেবল একটি সাধারণ সামরিক ব্যান্ড ছিল না, এটি নিজেই ছিল এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। উসমানীয় বাহিনী যখন বেলগ্রেড, কনস্টান্টিনোপল, রোডস, মোহাচ কিংবা ভিয়েনার দিকে অগ্রসর হতো, তখন প্রথম শোনা যেত বিশাল ঢাকের বজ্রগর্জন, জুরনার তীক্ষ্ণ সুর, তুরী আর ঝাঁঝরের ঝনঝনানি।
এই সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য সৈন্যদের বিনোদন দেওয়া ছিল না, বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষের মনে এমন এক মানসিক অভিঘাত সৃষ্টি করা, যাতে শত্রুরা বুঝে যায় তারা শুধু একটি সেনাবাহিনীর মুখোমুখি নয়, বরং একটি পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেহতেরের এই সুর মানুষের আত্মায় ভয় আর বিস্ময়ের কম্পন জাগিয়ে তুলতে পারত।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের এই অনন্য রণকৌশল ও সুরের গভীরতা দেখে পরবর্তীতে ইউরোপের বিভিন্ন সেনাবাহিনী নিজেদের সামরিক ব্যান্ডে উসমানীয় ঢাক, ঝাঁঝর এবং তথাকথিত ‘টার্কিশ স্টাইল’ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। এমনকি এর প্রভাব একসময় পৌঁছে যায় পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সঙ্গীতের কিংবদন্তি সুরকার ভলফগ্যাং আমাদেউস মোৎসার্ট, জোসেফ হেইডন এবং লুডভিগ ভ্যান বেথোভেনের অমর সৃষ্টিগুলোতেও।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাস সব সময় তরবারি দিয়ে কোনো সভ্যতাকে জয় করে না, কখনো কখনো একটি সুর বা ছন্দই বিজয়ের জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে। এরদোয়ানের এই জমকালো আনুষ্ঠানিকতাকে অনেকে হয়তো উসমানীয় সাম্রাজ্যকে পুনর্জীবিত করার (নিও-অটোম্যানিজম) রাজনৈতিক প্রচেষ্টা বলে মনে করতে পারেন, কিন্তু এর প্রকৃত তাৎপর্য আরও অনেক গভীরে।
তুরস্কের এই রাজকীয় আয়োজন প্রমাণ করে, তারা একটি ঐতিহাসিক সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে—অতীত কোনো বোঝা নয়, অতীত একটা গর্ব, একটা ঐতিহ্য এবং একটি জীবন্ত ভাষা। যে জাতি সেই ভাষায় কথা বলতে জানে, তারা শুধু বক্তৃতার পাতায় নিজেদের ইতিহাস সীমাবদ্ধ রাখে না; তারা রাষ্ট্রের প্রতিটি আচার, প্রতীক, সুর এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে নিজেদের ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে জীবন্ত করে তোলে।
