ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা, গণপিটুনি এবং পুলিশি এনকাউন্টারে দুইজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রোমহর্ষক এই ঘটনাটি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত রোববার পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর শহরের একটি পুকুর থেকে ১১ বা ১২ বছর বয়সি এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগের দিন শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়েছিল। পুলিশ জানায়, শিশুটিকে ধর্ষণের পর জীবিত অবস্থায় বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের পাশাপাশি শরীরে কামড় ও আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এই নৃশংস ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা এক ২৬ বছর বয়সি যুবককে মূল অপরাধী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে। তবে পুলিশ মূল সন্দেহভাজনদের আটক করার পর স্পষ্ট হয় যে, গণপিটুনিতে নিহত ওই যুবক সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন এবং ঘটনার সাথে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
লাশ উদ্ধারের পর ক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় দোকানপাটে ভাঙচুর চালায় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। গত মঙ্গলবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় মূল সন্দেহভাজন প্রকাশ মণ্ডলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, প্রকাশ তাদের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে এই ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। তবে বিরোধী দলগুলো পুলিশের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই ঘটনাটি এখন পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিরোধী দলগুলো এখন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলছে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের অভিযোগ—পুলিশ শুরুতে নিখোঁজের ঘটনাটিকে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি এবং তারা নিজেরাই সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মেয়েটিকে খুঁজতে বাধ্য হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গে নারীর নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু। ২০২৪ সালে কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি গত নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছিল, যা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পূর্ববর্তী সরকারের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। বর্তমান ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলতি সপ্তাহে বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের জেরে পুরো রাজ্যে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সংবেদনশীল এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে নারীর ওপর সহিংসতা বন্ধে তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে কট্টরপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের শিকার শিশুটি মুসলিম সম্প্রদায়ের হলেও পুলিশের কাছে অপরাধ স্বীকার করা মূল অভিযুক্তরা এবং গণপিটুনিতে নিহত নিরপরাধ ব্যক্তিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হিন্দু ব্যক্তির ওপর হামলার পেছনে ‘সাম্প্রদায়িক সংযোগ’ ও ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ রয়েছে। গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
