রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ আজিমপুর কবরস্থানকে ঘিরে কঙ্কাল পাচারকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। স্বজনদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত প্রায় ৩২ একরজুড়ে বিস্তৃত এ সমাধিস্থলে দিনের পর দিন ধরে গোপনে চলছে মরদেহ ও কঙ্কাল কেনাবেচার এই অনৈতিক বাণিজ্য।
এক বিশেষ অনুসন্ধানে এই চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও কার্যপদ্ধতি প্রকাশ পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কঙ্কাল বা মানুষের হাড় সরবরাহ করে থাকে। এই গোপন নেটওয়ার্কে কবরস্থানের কয়েকজন গোরখোদক ও তাদের সহযোগীরা সরাসরি জড়িত, যারা আগে থেকেই নির্দিষ্ট কবর চিহ্নিত করে সুযোগমতো মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে ফেলে।
মেডিকেল শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে ‘হিমেল’ ও ‘আল-আমিন’ নামে চক্রের দুই মূল সমন্বয়কারীর সন্ধান পাওয়া যায়। চক্রের সদস্যরা জানায়, সাধারণত ৬ থেকে ৭ মাস পুরনো, নামফলকবিহীন বা বেওয়ারিশ কবরগুলোকে তারা হাড় সংগ্রহের জন্য বেশি টার্গেট করে। একটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালের (২০৬টি হাড়) জন্য তারা ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকে।
চক্রটির কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুসংগঠিত। সন্ধ্যার পর নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরা এড়িয়ে তারা সুবিধাজনক সময়ে কবর খুঁড়ে হাড় বের করে ঘাসের বস্তায় ভরে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি মরদেহ থেকে সব হাড় অক্ষত পাওয়া যায় না বলে দুই বা তিনটি ভিন্ন মরদেহ থেকে হাড় সংগ্রহ করে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল তৈরি করে। লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে এবং কাজ শেষে একে অপরকে চেনে না—এমন নীতি অনুসরণ করে।
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, এই অবৈধ ও পৈশাচিক বাণিজ্যের পর নিজেদের পাপ ঢাকতে চক্রের সদস্যরা এক অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করেছে। অনুসন্ধান দলের কাছে চক্রের মূল হোতা হিমেল দাবি করেন, কঙ্কাল বিক্রি করে পাওয়া টাকার একটি অংশ তারা এতিমখানায় দান করেন, যাতে এই টাকা তাদের ভাষায় ‘হালাল’ হয়!
আজিমপুর কবরস্থানে দুই শিফটে সিটি করপোরেশন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ৮০ জনের বেশি কর্মী দায়িত্ব পালন করেন। তাদেরই একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কঙ্কাল বাণিজ্যের সত্যতা স্বীকার করে জানান, নির্দিষ্ট সময় পর মরদেহ এক কবর থেকে অন্য কবরে লুকিয়ে রেখে পরে সুবিধাজনক সময়ে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, কঙ্কাল চুরির নানা গুঞ্জন ও অভিযোগ শোনা গেলেও আজিমপুর কবরস্থান নিয়ে কখনো কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা লিখিত অভিযোগ থানায় জমা পড়েনি। লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিন আলী এবং লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানিয়েছেন, কঙ্কাল পাচারের সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
