পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে এক মুসলিম কিশোরীকে গণধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই বর্বরোচিত অপরাধের বিচার চেয়ে দল-মত ও ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে এবং ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
গণদাবি উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীদের ওপর ‘জিহাদি’ ট্যাগ লাগিয়ে এ পর্যন্ত ৩৮ জন প্রতিবাদকারীকে গ্রেফতার করেছে বারুইপুর থানা পুলিশ, যাদের মধ্যে সিংহভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যখন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন, তখন পুলিশ প্রশাসন বেছে বেছে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে নিশানা করে গ্রেফতারি অভিযান চালিয়েছে।
ঘটনায় আরও এক চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে অন্যতম প্রধান অভিযুক্তকে কেন্দ্র করে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, অন্যতম প্রধান এক অভিযুক্তকে এনকাউন্টার (ক্রসফায়ার) করে হত্যা করা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, ওই অভিযুক্ত গ্রেফতার হওয়ার পর প্রকাশ্যেই এই ঘটনার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের জড়িত থাকার কথা ফাঁস করে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, রাজসাক্ষী ধামাচাপা দিতে প্রশাসন তাকে পরিকল্পিতভাবে এনকাউন্টার করে স্তব্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
সবচেয়ে বড় বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে সরকারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও সহানুভূতির নীতি। এই ঘটনায় উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের বাড়িতে নিজে ছুটে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই নিহত ইন্দ্রজিতের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, নিহতের ভাইয়ের জন্য সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি, বাবার জন্য বার্ধক্য ভাতা এবং মায়ের জন্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও দ্রুত নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই একপেশে ও পক্ষপাতমূলক আচরণে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, এটি সাধারণ গণপিটুনি নয়, বরং পরিচয় জেনে পরিকল্পিতভাবে উগ্র মৌলবাদী ও রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ড। মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করার নীল নকশা বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
প্রশাসনের এমন কঠোর ও একপেশে নিপীড়নের মুখেও বারুইপুরে জঘন্য এই অপরাধের বিরুদ্ধে এবং নিরীহ প্রতিবাদকারীদের মুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন ও জোর প্রতিবাদ এখনও অব্যাহত রয়েছে। মূল অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি এবং পুলিশি হয়রানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিবাদকারীরা।
