ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধানসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আজ এই নোটিশ পাঠানো হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এইচ এম রেজওয়ানুল সাঈদ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নোটিশটি প্রেরণ করেন।
নোটিশে শওকত আলী চৌধুরীকে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিক এবং ব্যাংক খাতের বহুল আলোচিত এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনটি নির্বিঘ্নে দুবাইয়ে স্থানান্তরের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কেন যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী সাত দিনের মধ্যে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে; অন্যথায় যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
নোটিশদাতার অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পাচারকৃত সম্পদের তদন্ত চলাকালে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শওকত আলী চৌধুরীর নামে যুক্তরাজ্যে রক্ষিত ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সন্ধান পায়। ওই সময় তিনি অর্থটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মাশরেক ব্যাংক ও এমিরেটস এনবিডিতে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন।
যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক লেনদেনটি সাময়িকভাবে আটকে রেখে বিএফআইইউকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছিল—বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে ফ্রিজিং আদেশ বা আইনি সহায়তার (এমএলএ) অনুরোধ না পেলে লেনদেনটি আর আটকে রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু বিএফআইইউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২৫ মিলিয়ন ডলার অবাধে দুবাইয়ে স্থানান্তরিত হয়ে যায় এবং পাচারকৃত অর্থ জব্দ ও ফিরিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগটি রাষ্ট্র হারায়।
নোটিশে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিষয়টি গোপন সূত্রে জানতে পেরে শওকত আলী চৌধুরী ২০২৫-২৬ করবর্ষে ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ দেখিয়ে ওই সম্পদ ‘ঘোষণা’ বা বৈধ করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তবে নোটিশদাতার দাবি—প্রচলিত আইনে বিদেশে পাচারকৃত অপ্রদর্শিত সম্পদ কেবল কর পরিশোধের মাধ্যমে বৈধ করার কোনো সুযোগ নেই; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী এটি একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ।
এর আগে বিএফআইইউ দুই দফায় শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছিল। বিএফআইইউর নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেই ২৮টি ব্যাংকের ১৮৭টি হিসাবে প্রায় ৮ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গঠনের তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছিল বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারের সহযোগী হিসেবে তাঁর দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও এক অজ্ঞাত ‘অদৃশ্য সমঝোতায়’ তদন্ত প্রক্রিয়া বারবার থমকে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই অবস্থায় অনতিবিলম্বে ২৫ মিলিয়ন ডলার-সংক্রান্ত সমুদয় গোয়েন্দা তথ্য ও নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) চলমান অনুসন্ধানে সরবরাহের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি তফসিলি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ও তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাকে স্বপদে বহাল রাখা যায় কি না—অর্থাৎ তার ‘যোগ্য ও উপযুক্ত’ (ফিট অ্যান্ড প্রপার) মর্যাদা—তা অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
