ভারতে সম্প্রতি নিষিদ্ধ হওয়া এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে নেওয়া বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র “সাতলজ” (Satluj) বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতের পাঞ্জাবের রক্তাক্ত ইতিহাস, শিখদের ওপর চালানো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং আশির ও নব্বইয়ের দশকের গুম-গণহত্যার নৃশংস প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমাটি।
সিনেমাটির মূল পটভূমি গড়ে উঠেছে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ আন্দোলনের ব্যাকড্রপ এবং ১৯৮৪ সালের কুখ্যাত ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ পরবর্তী শিখ-বিরোধী দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর পাঞ্জাব পুলিশকে একপ্রকার অলিখিত ফ্রি-হ্যান্ড দেওয়া হয়, যার ফলে তারা সেখানে এক বিশাল ‘কিলিং স্কোয়াড’ বা গুম সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।
পাঞ্জাব পুলিশের এই অবাধ ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে হাজার হাজার নিরীহ শিখকে দিনে-দুপুরে গুম করে হত্যা করা হয়। এই গণহত্যার নির্মম সাক্ষী হয়ে আছে ‘সাতলজ’ নদী, যেখানে শত শত মানুষের মরদেহ পেট ফেঁড়ে বা পাথর বেঁধে ভাসিয়ে দেওয়া হতো, যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। পরবর্তীতে নদী থেকে প্রমাণ লোপাট করতে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে শ্মশানে নিয়ে হাজার হাজার মানুষকে পুড়িয়ে ফেলার এক নারকীয় উৎসব শুরু হয়।
এই ভয়াবহ সত্য ও রাষ্ট্রীয় জেনোসাইডের বিরুদ্ধে একক লড়াইয়ে নামেন যশবন্ত সিং খালরা নামের এক সাধারণ ব্যাংকার। তিনি বিভিন্ন শ্মশানের রেজিস্ট্রি খাতা ঘেঁটে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে বেওয়ারিশ হিসেবে পুড়িয়ে ফেলার অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করেন এবং এই গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলশ্রুতিতে ভারতের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়ে যশবন্ত সিং খালরাকেও গুম হতে হয় এবং পরে থানার ভেতর নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাঁর লাশও সাতলজ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
চলচ্চিত্রটিতে যশবন্ত সিং খালরার প্রধান চরিত্রে অনবদ্য ও হাড়হিম করা অভিনয় করেছেন পাঞ্জাবের বর্তমান সময়ের অন্যতম মিউজিক্যাল সুপারস্টার ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দিলজিৎ কোনো পারিশ্রমিক নেননি। প্রায় ৩৫ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড ১২০টি কাটের দাবি জানালে নির্মাতারা ওটিটিতে এটি মুক্তি দেন, যা ভারত সরকার দ্রুতই নিষিদ্ধ ও ব্লক করে দেয়।
দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, “সাতলজ” কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের লুকিয়ে রাখা পরম সত্য ও নৃশংস ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। সিনেমাটির প্রতিটি চরিত্রের বাস্তবসম্মত অভিনয় এবং বুক ফাটানো কিছু দৃশ্য দর্শকদের কাঁদিয়ে ছাড়ছে। চলচ্চিত্রটি বর্তমানে ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে এটি গুম ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
