বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের মিলন মেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পিকারকে সংসদ পরিচালনায় আরও দৃঢ় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ যত সুন্দর ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে, ততই মানুষের হতাশা দূর হবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়বে এবং দেশ গঠনে জনগণ আরও উৎসাহিত হবে। তিনি স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, সংসদের অভিভাবক হিসেবে আরও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদর্শন করা প্রয়োজন এবং সংসদীয় বিধি-বিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। তিনি ঢাকার সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ঢাকার বর্তমান সংকট কোনো একক সরকার বা সংসদের সৃষ্টি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। উন্নয়নের নামে জনগণের পরিবর্তে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সুবিধা পেলেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধীদলের আরও কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়ে জামায়াত আমির বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে বিরোধী দলের মতামত যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত। অন্যথায় সংসদে উপস্থিতি জনগণের সময় ও অর্থের অপচয়ে পরিণত হবে।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি, কর্মমুখী, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি, কর্মমুখী, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বরাদ্দের পাশাপাশি মৌলিক সংস্কারও জরুরি।
বাজেট বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যরা বরাদ্দ পেলেও বিরোধীদলের ১৩ জন সদস্য এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জনগণের স্বার্থে এ বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া সরকারি দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ায় সমন্বয়ের পরিবর্তে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে।
জনগণের অর্থে বিভিন্ন স্থাপনায় নামফলক স্থাপনের সংস্কৃতিকে অপচয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রকল্পে ব্যক্তির নামের পরিবর্তে শুধু প্রকল্পের তথ্য উল্লেখ থাকলেই যথেষ্ট। এতে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় বিতর্কও কমবে।
সংসদে অতীতের সংঘাতমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমালোচনা অবশ্যই হবে, তবে তা সংসদীয় রীতিনীতি মেনেই হওয়া উচিত। সংসদকে উত্তপ্ত করার পরিবর্তে যুক্তি, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দেন তিনি।
দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ব্যাংক, বীমা, করপোরেশন, শেয়ারবাজারসহ সব খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোনো দুর্নীতিবাজকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ও গণভোটের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন এবং জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি এ ইতিহাস সংরক্ষণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন।
সবশেষে তিনি সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ এবং বাজেট অধিবেশন পরিচালনায় সম্পৃক্তদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ প্রণোদনা দেওয়ারও আহ্বান জানান।
