নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রাথমিক শিক্ষা খাতে ‘বদলি-বাণিজ্যে’র একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মাত্র চার মাসে বিধিবিধানকে তোয়াক্কা না করে প্রায় দুই হাজার শিক্ষকের অবৈধ বদলি সম্পন্ন করেছে চক্রটি। এর মাধ্যমে শিক্ষকপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে অন্তত ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
উদ্বেগজনক এই জালিয়াতির ঘটনাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে বদলির ক্ষেত্রে ঘটেছে। গত মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে এসব বদলি করা হয়। যার সিংহভাগই নিয়মনীতি ভেঙে প্রেষণ বা সংযুক্তির মাধ্যমে ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরের নামি স্কুলগুলোয় পদায়ন করা হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আসার পর তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষক বদলি শতভাগ অনলাইনে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আদেশগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশের নিয়ম থাকলেও এই চক্রটি সম্পূর্ণ অফলাইনে হাতে হাতে আদেশ জারি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর বর্তমানে এই ‘বদলি-বাণিজ্য’ বন্ধ রয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তে নেমেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জুন এই অনিয়মের খবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে (যিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন) ডেকে পাঠান এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। শিক্ষামন্ত্রী তখন প্রধানমন্ত্রীকে জানান, এই অনিয়ম রুখতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক তদবির বন্ধ করা প্রয়োজন।
মন্ত্রণালয়কে তদবিরমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে শিক্ষামন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী গত ২১ জুন উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয়— এই চার স্তরের কমিটি গঠন করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষক বদলি শতভাগ স্বচ্ছ হোক। জটিলতা দূর করতেই এই চার স্তরের কমিটি করা হয়েছে, এখন থেকে কমিটির সুপারিশেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে বদলি হবে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ৯৪৪টি বদলি হয়েছে গত মার্চ মাসে। এরপর এপ্রিল, মে ও জুনের ২০ তারিখ পর্যন্ত এই বাণিজ্য চলেছে। নিয়মনীতি ভেঙে কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকদের ঢাকার নামিদামি স্কুলে সংযুক্ত করা হয়। শুধু রাজধানীতেই নয়, এই বদলি-বাণিজ্যের জাল বিস্তৃত ছিল নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলাতেও।
প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত এড়াতে বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ— এই তিন মাস বদলির নির্ধারিত সময়। কিন্তু এবার বছরের মাঝামাঝিতেও নিয়মের বাইরে গিয়ে অফলাইনে এই বদলি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানান, বদলির অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়, তাঁরা শুধু তা বাস্তবায়ন করেন। অনলাইনে না হয়ে কেন অফলাইনে হলো, সেই ব্যাখ্যা মন্ত্রণালয়ই দিতে পারবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন আশা প্রকাশ করেছেন যে, নতুন চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে গত চার মাসের বিশৃঙ্খল পরিবেশ অনেকটাই কমে আসবে। তিনি দাবি করেন, যেসব বদলি হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই করা হয়েছে এবং প্রতিটি আদেশের প্রমাণ সংরক্ষিত আছে।
এই অনিয়মের বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রচলিত অনলাইন বদলি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে হাতে হাতে আদেশ জারি করাই প্রমাণ করে যে পর্দার আড়ালে এক বিশাল সিন্ডিকেট কাজ করেছে। এই ঘটনা সরকারের ডিজিটাল প্রশাসন ও সুশাসনের লক্ষ্যকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
