বাংলাদেশের যেসব হাসপাতালে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) করা হয়, সেখানে নারী লাশের সম্ভ্রম ও গোপনীয়তা রক্ষায় কেন অন্তত একজন করে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রোববার (১৯ জুলাই) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।
আদালতে জনস্বার্থে দায়ের করা এই রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মনির উদ্দিন। রিটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। এর আগে হাসপাতালগুলোতে নারী ডোম নিয়োগের দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন এই আইনজীবী।
রিট আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রাষ্ট্র, যেখানে ইসলামসহ সব ধর্মেই নারীর মরদেহ সতর বা পর্দার অন্তরালে রাখার বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্ত একটি আইনি ও চিকিৎসাগত প্রক্রিয়া হলেও মৃত নারীর শরীর কোনো পরপুরুষের দ্বারা স্পর্শ বা ব্যবচ্ছেদ করা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারীরা সব ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও ময়নাতদন্তের মতো সংবেদনশীল জায়গায় নারী ডোম না থাকাটা এক ধরনের বৈষম্য।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে কোনো নারী মারা গেলে তাঁর পরিবার এমনিতেই চরম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। এমন পরিস্থিতিতে যখন তাঁরা জানতে পারেন যে কোনো পুরুষ ডোম তাঁদের পরিবারের প্রিয় নারী সদস্যের লাশের ময়নাতদন্ত করবেন, তা স্বজনদের জন্য আরও বেশি হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে। সেখানে একজন নারী ডোম থাকলে পরিবারের সদস্যরা ওই দুঃসময়ে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পেতেন। এছাড়া মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে রিটে উল্লেখ করা হয়, অতীতে দেশের বিভিন্ন মর্গে পুরুষ ডোমের দ্বারা মৃত নারীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের মতো লোমহর্ষক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক তরুণীর লাশের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগে ডোম আবু সাঈদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গেও একই অভিযোগে মুন্না ভগত নামে এক ডোমকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি, যে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেছিল।
এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উদাহরণ টেনে আবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি মর্গে কেনেট ডগলাস নামের এক মর্গ কর্মী ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাতের শিফটে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রায় ১০০টি নারী লাশের সঙ্গে বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করার কথা স্বীকার করেছিল। এই সমস্ত ভয়াবহ ও বিকৃত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে এবং মৃত নারীদের মরণোত্তর সম্ভ্রম ও মর্যাদা সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিটি পোস্টমর্টেম হাসপাতালে দ্রুত নারী ডোম নিয়োগ করা যুগোপযোগী ও অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।
