বাংলাদেশি পাসপোর্টে দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধটি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাদ পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানটি ফিরিয়ে এনে রোববার (১৯ জুলাই) এক বিশেষ সরকারি আদেশ জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন-৪ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের সই করা এক আদেশের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তটি জানানো হয়।
সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন থেকে নতুন ই-পাসপোর্ট বুকলেটে বিদ্যমান ছবিগুলো সম্পূর্ণ পুনর্বিন্যাস করে এর সামগ্রিক নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধন আনা হয়েছে। পাসপোর্টের ভেতরের জলছাপ বা ওয়াটারমার্কগুলো সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে সব ধর্মের ধর্মীয় উপাসনালয়ের ছবি স্থান পেয়েছে। ধাপে ধাপে নতুন সব পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ লেখাটি যুক্ত হবে এবং পুরোনো পাসপোর্টধারীদের মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের সময় এই নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট দেওয়া হবে।
নতুন সংস্করণের এই ই-পাসপোর্টের জলছাপে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সংযোজন হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’। ঐতিহাসিক এই আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে তিনটি বিশেষ ছবি যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে দুই হাত প্রসারিত করে বীরত্বগাথা তৈরি করা শহীদ আবু সাঈদের ছবি, উত্তরার আজমপুরে তৃষ্ণার্তদের পানি ও ওআরএস বিতরণের সময় শহীদ হওয়া মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ছবি এবং জাতীয় পতাকার জার্সি পরিহিত চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরামের ছবি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি নতুন পাসপোর্টের ৪৮ ও ৬৪ পৃষ্ঠার বুকলেটে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। নতুন জলছাপগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় ফুল শাপলা, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, দোয়েল পাখি, শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, শিখা অনির্বাণ, লালবাগ দুর্গ, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, টাঙ্গুয়ার হাওর, ইলিশ মাছ, বান্দরবানের নীলগিরি ও স্বর্ণমন্দির, আহসান মঞ্জিল, জাতীয় ফল কাঁঠাল, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, রাজশাহীর আমবাগান, পানামনগর, কার্জন হল, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাট, চা-বাগান, সুন্দরবন, খ্রিষ্টধর্মের হলি রোজারি চার্চ এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’।
অন্য দিকে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুক্ত করা বেশ কিছু মেগা প্রজেক্ট এবং দলীয় ও রাজনৈতিক জলছাপ নতুন পাসপোর্ট থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়া জলছাপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের জলছাপে থাকা নৌকার ছবি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যখন ই-পাসপোর্ট প্রবর্তন করা হয়, তখন সুকৌশলে পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল প্রসঙ্গটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পাসপোর্টের এই জাতীয় ও কূটনৈতিক চরিত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর এই যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো।
