খেলাধুলা কখনো অরাজনৈতিক বা ধর্ম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারে না—আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি যেন সেই চিরন্তন সত্যকে আবারও প্রমাণ করল। মাঠের বাইরে ভূরাজনীতি, ধর্ম ও পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দাবার চাল এমন এক সমীকরণ তৈরি করেছিল, যা সাধারণ একটি ম্যাচকে বিশ্বরাজনীতির প্রতীকে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত সব সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নস্যাৎ করে দিয়ে বিশ্বফুটবলের নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে ইউরোপের দেশ স্পেন।
এই মেগা ফাইনালের আগে মাঠের বাইরে বৈশ্বিক মেরুকরণ ছিল বেশ স্পষ্ট। লিবিয়া যখন মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীনের সাথে হাত মিলিয়েছে, ঠিক তখনই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইসরায়েল শুধু আর্জেন্টিনাকেই সমর্থন দেয়নি, বরং দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে ‘আসল সুপারস্টার’ ও ‘সবচেয়ে বড় বন্ধু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, যিনি নিজেও নিজেকে গর্বের সাথে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধান’ দাবি করেন।
অন্য দিকে, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক স্কলার মুফতি মেঙ্ক থেকে শুরু করে কোটি কোটি ফিলিস্তিনি ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাবাসী মনেপ্রাণে স্পেনের বিজয় প্রার্থনা করেছিলেন। কারণ, ইউরোপের একমাত্র দেশ হিসেবে স্পেন ফিলিস্তিনের গণহত্যার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করেছে এবং ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন স্পেনের আকাশপথ ও ভূমি ব্যবহার করে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালাতে চেয়েছিল, তখন স্পেন দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে আমেরিকার দাসত্ব করতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে আমেরিকার সাথে তাদের বড় ধরনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছিল।
রাজনীতির এই প্রবল উত্তেজনার মধ্যেই আমেরিকার মাটিতে, মার্কিন গ্যালারির সামনে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে স্পেন। স্পেনের এই চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেবল ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গালে এক পরোক্ষ চপেটাঘাত। ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপে যে ১৯ বছর বয়সী তরুণ লামিনে ইয়ামালের প্রতিকৃতি এঁকে গাজার শিশুরা স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই ফিলিস্তিনপন্থী তরুণই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় পরেছেন, যিনি এর আগে বার্সেলোনায় শিরোপা জেতার পর ছাদখোলা বাসে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছিলেন।
আমেরিকা এবং তাদের মিত্ররা যে ক্রীড়াঙ্গনকে ধর্ম ও রাজনীতির চোখে দেখে, তা তাদের আচরণেই স্পষ্ট। কিছুদিন আগেই মার্কিন হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানিরা যখন মাত্র ৬ ঘণ্টায় শহীদ মিরজাই টানেল সচল করে প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছিল, তখন আমেরিকার মাটিতে ইরানি ফুটবল দলকে খেলা শেষের মাত্র ১ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, এমনকি সোমালিয়ার বিশ্ববিখ্যাত রেফারিকেও মার্কিন ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। ফিফা আজ কেবল বিনোদনের জায়গায় নেই, এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক বিশাল দাবা খেলায়, যেখানে স্পেনের জয় আসলে পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিন ও ইরানের মতো মজলুমদেরই প্রতীকী বিজয়।
খেলা আর রাজনীতি যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তার প্রমাণ কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেও স্পষ্ট। দেশের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকেও রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ক্ষমতার পালাবদলের চরম বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আজ দেশের বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে। ফলে মাঠের পারফরম্যান্স যতই নিখুঁত হোক না কেন, মাঠের বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রীড়াবিদ ও খেলার ভাগ্য নির্ধারণে যে কতখানি শক্তিশালী ভূমিকা রাখে, স্পেনের এই ঐতিহাসিক দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনাটি তা ইতিহাসের পাতায় আরও একবার স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখল।
