২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। চট্টগ্রামের মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট ও বহদ্দারহাটজুড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছিল। সেদিন বিকেলে স্বৈরাচারী শক্তির নগ্ন হামলায় মাথা ও বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে বীরত্বের সঙ্গে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম। তবে ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়া ঢিমেতালে চলায় এবং মূল শুটার গ্রেপ্তার না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার।
সহপাঠী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই দুপুরের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলা শুরু হয়। প্রথমে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হলেও পরে তা নির্বিচার গুলিবর্ষণে রূপ নেয়। বিকেল চারটার দিকে বহদ্দারহাট এলাকায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় বুকে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৭ জুলাই চট্টগ্রামে প্রথম জানাজা শেষে পরদিন নিজ গ্রাম মেহেরনামায় দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন করে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামা গ্রামের সন্তান ওয়াসিম ছিলেন বাবা শফিউল আলম ও মা জ্যোৎস্না বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। অত্যন্ত মেধাবী এই তরুণের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়া। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বুলেট সেই স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দেয়। মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পর প্রকাশিত অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফলাফলে জানা যায়, ওয়াসিম সিজিপিএ-তে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন, যা তাঁর পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে এক বেদনাময় ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়াসিম আকরাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চট্টগ্রাম কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ১৬ জুলাই দুপুরে সমাজমাধ্যমে দেওয়া নিজের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে ওয়াসিম লিখেছিলেন, তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে নিজের সংগঠনের পরিচয়ে দেশের জন্য শহীদ হতে চান। সেই ঐতিহাসিক স্ট্যাটাসের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই মুরাদপুরে ছাত্রলীগের সশস্ত্র অবস্থানের খবর সহযোদ্ধাদের ফোন করে জানিয়ে সতর্ক করেছিলেন তিনি, যাতে আন্দোলনকারীরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন। এর পরপরই নিজে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে গিয়ে ফ্যাসিবাদের বুলেটের শিকার হন এই নির্ভীক ছাত্রনেতা।
ওয়াসিমের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর মা জ্যোৎস্না বেগম বাদী হয়ে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং স্থানীয় ক্যাডারদের আসামি করা হয়। মামলার অন্যতম এক অভিযুক্ত ফটিকছড়ির সুয়াবিল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জাহেদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও, পরিবারের দাবি—ভিডিও ফুটেজে অস্ত্রহাতে প্রামাণ্য মূল অভিযুক্ত ও চকরিয়ার কুখ্যাত শুটার রাশেদ এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারপ্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।
এদিকে শহীদ ওয়াসিম আকরামের এই মহান আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের নতুন ই-পাসপোর্টের জলছাপে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪’-এর প্রতীক হিসেবে তাঁর ছবি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত নবনির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণ করেছে তাঁর নামে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরীর আমবাগানের সাবেক শেখ রাসেল পার্কের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম পার্ক’ রেখেছে এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর স্মরণে একটি প্রতিকৃতিও স্থাপন করা হয়েছে।







