বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অবৈধভাবে দখলে থাকা এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অলিখিত রাজনৈতিক কার্যালয় ও সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হওয়া নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শুটিং ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত চাষাঢ়া এলাকার এই সরকারি স্থাপনাটি দীর্ঘ দিন পরিত্যক্ত থাকার পর অবশেষে জেলা প্রশাসনের অনুমতিতে সংস্কারের মুখ দেখছে।
রাইফেল ক্লাবটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনার জন্য ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত ছিল। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শামীম ওসমান শত শত অস্ত্রধারী অনুসারী নিয়ে এই ক্লাব থেকেই অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র বের করে আন্দোলন দমনে নামে, যার ভিডিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ৪ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা রাইফেল ক্লাবে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর শামীম ওসমান দেশ ছাড়লে ক্লাবটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ দিন পর পদাধিকার বলে রাইফেল ক্লাবের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের অনুমতি এবং সিনিয়র কয়েকজন শুটারের যৌথ উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী এই স্পোর্টস ক্লাবটি আবারও সচল হতে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের সিনিয়র সদস্য ও সাবেক শুটার এম এ সাত্তার ভুট্টু জানান, শুটিং ফেডারেশনের শর্ত অনুযায়ী ক্লাব সচল না থাকলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। এই বাধ্যবাধকতার কথা জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা সম্প্রসারণের জায়গা বাদ রেখে বাকি অংশ পরিষ্কার ও সংস্কার করে ক্লাবটি চালুর অনুমতি দেন।
সাত্তার ভুট্টু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে এই ক্লাবের সঙ্গে জড়িত থাকলেও একপর্যায়ে নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানরা ক্লাবটিকে এককভাবে কবজা করে সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত করেন। শামীম ওসমানের ভয়ে ক্লাবের প্রকৃত ক্রীড়াবিদ ও ভদ্রলোকদের দীর্ঘ দিন ক্লাবে আসা বন্ধ ছিল, এমনকি অনেককে দেশ ছেড়েই পালিয়ে থাকতে হয়েছিল। এখন ক্লাবটি চালুর মাধ্যমে এটিকে রাজনৈতিক কলঙ্কমুক্ত করে আবার একটি সম্পূর্ণ ক্রীড়াভিত্তিক ও সুস্থ পরিবেশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, শিশুরা এবং প্রশিক্ষণার্থীরা যাতে ক্লাবে পুনরায় প্রশিক্ষণ ও খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য আপাতত ছোট পরিসরে সংস্কার করে ক্লাবের কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী অন্য কোথাও ক্লাবের নতুন নিজস্ব ভবনে বড় পরিসরে কার্যক্রম স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শামীম ওসমান এই রাইফেল ক্লাবের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেন। নারায়ণগঞ্জের বড় বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার ফাঁসির আসামি নূর হোসেনের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও এখানে এসে শামীম ওসমানের কাছে হাজিরা দিতো। ক্লাবের ভেতরে শামীম ওসমানের একটি গোপন টর্চারসেল ছিল, যেখানে তাঁর মতের ভিন্নতা পোষণকারীদের ডেকে এনে নির্মম নির্যাতন করা হতো। ২০১১ সালের পর নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া আশিক, চঞ্চল, বুলু, ত্বকী ও সাত খুনসহ একের পর এক হাইপ্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই স্থাপনাটি। এ ছাড়া পুরো শহরের ঝুট সেক্টর, ফুটপাতের হকার, চাঁদাবাজি এবং সরকারি বড় বড় টেন্ডারও এই রাইফেল ক্লাব থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো।







