চব্বিশের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ’ চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক। গলা ফাটিয়ে শেখ মুজিবের বন্দনা করা এবং আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মো. কামাল উদ্দিনের উপস্থিতি এখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। আওয়ামী জমানায় রাজপথে সোচ্চার থাকা এই বিতর্কিত ব্যক্তি রাতারাতি খোলস পাল্টে পৌঁছে গেছেন খোদ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়। সম্প্রতি সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাই-প্রোফাইল বৈঠক ও নৈশভোজে সরাসরি অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল করমর্দনের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রামে সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন বিতর্কের কারণে ‘ব্যাটারি কামাল’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি বহুরূপী পরিচয়ে চলাফেরা করতেন। আওয়ামী শাসনামলে তিনি শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার অন্ধ অনুসারী হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কখনো সাংবাদিক, কখনো কলামিস্ট, আবার কখনো মানবাধিকার সংগঠনের নেতা পরিচয়ে সুবিধা লুটেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যখন রাজপথে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরছিল, তখনও তিনি আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে একাধিক মানববন্ধন ও মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ৪১টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আয়োজিত স্পর্শকাতর এই বৈঠকে ১৮৪ জন আমন্ত্রিত প্রতিনিধির তালিকায় কীভাবে এই চিহ্নিত চাটুকারের নাম অন্তর্ভুক্ত হলো, তা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন তৎপর হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি কোনো সাংবাদিক বা নাগরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়; বরং ‘গণদল’ নামে একটি দলের ভাইস চেয়ারম্যান পরিচয়ে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রতিনিধি হিসেবে ওই বৈঠকে অংশ নেন। রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তায় কীভাবে গলদ তৈরি হলো, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
রাজনৈতিক তোষামোদের পাশাপাশি তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সরকারি নথিপত্র (পিসিপিআর) থেকে জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং ২০১৪ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবা সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ২০১২ সালে চট্টগ্রামের ‘আফতাব কনকর্ড’ ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সে মদ্যপ অবস্থায় তাণ্ডব চালানো, নিরাপত্তা প্রহরীদের মারধর এবং ভবনের বাসিন্দাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ফ্ল্যাট মালিক সমিতি তাঁকে ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
যমুনায় তাঁর উপস্থিতির বিষয়ে গণদলের চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, মো. কামাল উদ্দিনকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আগের সরকার সৈনিক লীগের দায়িত্ব দিয়েছিল। অন্যদিকে অভিযুক্ত কামাল উদ্দিন তাঁর অতীত তোষামোদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আওয়ামী বলয়ে থেকে সুবিধা নেওয়ার কথা অস্বীকার করতে পারেননি।
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। দেড় দশক ধরে জেল-জুলুম ও ত্যাগের শিকার হওয়া ত্যাগী নেতাকর্মীদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারের দোসরদের খোলস পাল্টে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা। অনতিবিলম্বে এ ঘটনার সঠিক তদন্ত করে অনুপ্রবেশের নেপথ্যে থাকা সহযোগীদের চিহ্নিত করার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
