একসময়কার প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের আইনি কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ নিজেকে তুরস্কের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে এবং একাধিক দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজর এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। দুবাই পুলিশ পরিচয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করলে সরকারও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক সহযোগিতা করছে। প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র ও আইনি যোগাযোগ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশের এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বেনজীর আহমেদকে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, বিদেশ থেকে কোনো অভিযুক্তকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনি জটিলতা থাকে।
তবে সব প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করে তাকে দেশে এনে বিচার করা গেলে তা সরকারের জন্য বড় সাফল্য হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে বিদেশে পালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বিচার এড়ানো যায় না।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্বে থাকাকালে বেনজীর আহমেদ পেশাদারিত্বের সীমা অতিক্রম করে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন। তাকে বিচারের আওতায় আনা গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও জবাবদিহিতার বার্তা পৌঁছাবে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের সময় বেনজীর আহমেদ নিজেকে তুরস্কের নাগরিক দাবি করে ওই দেশের পাসপোর্ট প্রদর্শন করেন। পরবর্তী তল্লাশিতে তার সঙ্গে বাংলাদেশের পাসপোর্টসহ মোট পাঁচটি দেশের পাসপোর্ট বা পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে পর্তুগালের পাসপোর্টও রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ই-মেইলের মাধ্যমে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানোর বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুবাই থেকে যোগাযোগ পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠায়। পরে দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করতে ছবি, গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত নথি এবং মামলার বিভিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত আইনি ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয়। এর জবাবে বাংলাদেশ সরকার আরবি ভাষায় প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয় নিশ্চিত করে উত্তর পাঠিয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের চাওয়া আইনি ব্যাখ্যা ও মামলার নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদক বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, দায়িত্বে থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে তিনি দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক শেয়ার অর্জন করেন। এছাড়া পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে পরিচয় গোপন করে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে দুদকের অধীনে তার বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলা রয়েছে; এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে এবং বাকি মামলাগুলোর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
