আওয়ামী লীগ শাসনামলে বরিশালের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর প্রাসাদসম ‘সেরনিয়াবাত ভবন’। নগরের কালীবাড়ি রোডের এই বাড়িটি থেকেই তখন পুরো দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের আওয়ামী রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হতো। এমনকি হাসানাতের ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হওয়ার পর নগর ভবনের কার্যক্রমও মূলত পরিচালিত হতো এখান থেকেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই ভবনের অনুমোদন ও ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভাগ্য। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন বেচাবিক্রি হতো এখানে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের জন্য এই ভবনে প্রবেশ করা ছিল বেশ কঠিন। সাবেক এক উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, পুরো পরিবারটি রাজকীয় কায়দায় চলত এবং তাদের ইচ্ছা ছাড়া কারও পক্ষে তাদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হতো না।
পদ্ধতিগত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবনটিকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ভাষ্যমতে, ওই ভবনে তৎকালীন সময়ে একাধিক কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। গুরুত্বর আহত অবস্থায় সেই কর্মকর্তাকে পাশের একটি ক্লাবে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হলে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ষাটের দশকে স্থানটিতে টিন ও গোলপাতার একটি ঘর ছিল, যেখানে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বাস করতেন। ১৯৭৩ সালে তাঁর ছেলে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ভবনটিকে দোতলা প্রাসাদে রূপান্তর করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ভবন ঘিরে ভূমি দখল ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগ আরও প্রকট হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিনই হামলা ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয় সেরনিয়াবাত ভবন। পরবর্তীতে এক্সকেভেটর দিয়ে ভবনের বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একসময়ের প্রতাপশালী এই ক্ষমতার কেন্দ্রটি এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে জঙ্গল ও পরগাছায় ছেয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে বাতি না জ্বলা এই পরিত্যক্ত স্থানটি শিয়াল ও কুকুরের স্থায়ী আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
