রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এক ছাত্রীকে অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া একটি অভিযোগ শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাসজুড়ে সংঘর্ষ, হামলা, পাল্টা হামলা এবং রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের বেলচা হাতে উপস্থিতির ঘটনায় রূপ নিয়েছে। পুরো ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের এক শিক্ষার্থী (ছদ্মনাম জ্যাকুলিন) ২৬ জুলাই প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলম তাকে কয়েকদিন ধরে উত্ত্যক্ত করছিলেন। পরে জোর করে পদ্মা নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেন। তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ছুরি ও পিস্তল দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, পদ্মায় ফেলে দেওয়ার হুমকি এবং পরে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী কান্নাকাটি করলে অভিযুক্ত তাকে মেসে ফিরিয়ে আনলেও কিছু সময় পর আবারও পদ্মার পাড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসব ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ওই শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা ও বিচার চান।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযোগপত্রেই তার বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ঘটনার আরও কিছু বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
অভিযোগ পাওয়ার পর ২৬ জুলাই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন উপস্থিত হয়ে মহসিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ সময় প্রক্টরের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হওয়ায় বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি।
পরদিন আবারও বৈঠক ডাকা হলে সেখানে রাকসুর নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক চলাকালে আনাসের মোবাইল ফোনে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে তার কিছু ছবি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন রাকসু নেতারা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও আনাসের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, নারীঘটিত অভিযোগের তদন্ত চলাকালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আনাস তার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়লে তাকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় বৈঠকেও একই ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
অন্যদিকে আনাস দাবি করেন, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে বন্ধুদের সঙ্গে তোলা কিছু ছবি থাকলেও তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রক্টর কার্যালয়েই সালাহউদ্দিন আম্মার তাকে মারধর করেন।
ঘটনার জেরে পরে রাকসু ভবনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাকসু নেতাদের অভিযোগ, আনাস ও তার সহযোগীরা রাকসু ভবনে ঢুকে হামলা চালান। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। হামলার পর অভিযুক্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন বলে দাবি করা হয়।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আলোচিত ঘটনার জন্ম হয়। সালাহউদ্দিন আম্মারকে বেলচা হাতে লাইব্রেরির সামনে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তেজিত নেতাকর্মীরা পরে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেন। হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও একজন আহত শিক্ষার্থীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে আবারও মারধরের অভিযোগ ওঠে।
সালাহউদ্দিন আম্মার অবশ্য দাবি করেন, তারা প্রথম থেকেই অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসন ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি বলেন, রাকসু ভবনে হামলার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির এবং সিনেট সদস্য ফাহিম রেজাও দাবি করেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরবর্তী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হতো। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগেই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে মারধরের শিকার শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানের বাবা মতিহার থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৭ থেকে ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
