গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে চলে যাওয়া আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তা ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপ। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শেষ মুহূর্তের ফোনালাপের অডিও এবং ব্যক্তিগত ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া একটি অডিও কল ট্র্যাকিং করে দেখা যায়, ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদকে জানান যে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং সেনাপ্রধান পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৪ ঘণ্টা সময় চেয়েছেন। কললিস্ট অনুযায়ী, ৪ আগস্ট রাতে মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা দীর্ঘক্ষণ যোগাযোগ রক্ষা করেন। এরপর ৫ আগস্ট ভোর থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর টানা কথা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি ও তথ্য-প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা জানান, ৩ আগস্ট থেকেই বেশ কিছু রহস্যজনক নম্বর থেকে ভারতে ঘনঘন যোগাযোগ শুরু হয়েছিল। তবে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেল (এনটিএমসি) থেকে এসব ফোনালাপের পূর্ণাঙ্গ তথ্য তদন্ত ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ না করায় বিষয়টির অধিকতর তদন্ত প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
উড্ডয়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৫ আগস্ট বিএএফের এমআই-১৭ হেলিকপ্টারে আগারগাঁও থেকে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনাকে ‘সি-১৩০জে হারকিউলিস’ মডেলের বিশেষ বিমানে (কল সাইন ‘AJX1413’) তোলা হয়। সাধারণত উড্ডয়নের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হলেও মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ট্যাক্সি ক্লিয়ারেন্স ও টেক-অফের অনুমতি নিয়ে ফ্লাইটটি ‘স্ক্রাম্বল’ বা যুদ্ধকালীন জরুরি প্রক্রিয়ায় আকাশে ওঠে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটির যোগাযোগ ট্র্যাকিং ডিভাইস (ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ সীমানা পার হতে সাতক্ষীরা সীমান্ত ব্যবহার করা হয়।
এ ঘটনায় সামরিক ও বেসামরিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (রাফা) সভাপতি কর্নেল (অব.) আব্দুল হক। কোনো প্রকার কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, ডিপ্লোমেটিক ক্লিয়ারেন্স বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে একটি রাষ্ট্রীয় সামরিক উড়োজাহাজে দেশত্যাগ সম্ভব হলো, তা নিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞরা।
