মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে যখন নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তখন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তিন দেশ ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে চুক্তিতে সই করে।
চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমন্বয় ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দেশগুলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন পর্যন্ত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার পর নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজানোর অংশ হিসেবেই তিন দেশ এই উদ্যোগ নিয়েছে।
চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বাড়তে থাকা প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা?
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেনের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সংশয় রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগের ব্যর্থতা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন এই চুক্তির উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত বিকল্প তৈরি করতে চাইছে।
বিশেষ করে সৌদি আরব যে ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে, মক্কা চুক্তিকে তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, নতুন এই চুক্তি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইঙ্গিত।
তার মতে, চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আঞ্চলিক দেশগুলো কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে মূল্যায়ন করছে, এটি তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতও আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে। ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক মনে করেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তার মতে, তিন দেশই আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে সংঘাত কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিরোধমূলক বার্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তির তাৎক্ষণিক সামরিক কার্যকারিতার চেয়ে এর কৌশলগত ও প্রতিরোধমূলক বার্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধের পর পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করে ফেলেছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো কঠিন। তবে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন অংশীদার, নতুন কৌশল এবং নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ খুঁজছে—চুক্তিটি তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
