দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপির বর্তমান মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সর্বশেষ প্রাপ্ত রাজনৈতিক সূত্রগুলোর খবর অনুযায়ী, মির্জা ফখরুলই হতে যাচ্ছেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি। আর তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে আসীন হলে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দলটির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
দলের ভেতরের তথ্য অনুযায়ী, মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বর্তমানে তিনি প্রভাবশালী মন্ত্রীদের তালিকায় না থাকলেও, মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের সর্বস্তরের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় মাঠপর্যায়ে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও মির্জা ফখরুলকে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুল মহাসচিবসহ দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নিবেদিতপ্রাণ নেতা রিজভী আহমেদকেই দলের পরবর্তী ‘ফুলটাইম’ মহাসচিব হিসেবে সবচেয়ে যোগ্য মনে করছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপিতে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদটিকে পরবর্তী মহাসচিব পদের প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর আগে ২০০৯ সালে মির্জা ফখরুল নিজে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত ও পরে ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পান। রুহুল কবির রিজভীর ক্ষেত্রেও প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী জানান, মহাসচিব পদের বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। তিনি কেবল দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশনায় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দল তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটি সম্পূর্ণ বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন।
সরকার গঠনের আগে মহাসচিব পদের আলোচনায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নাম শোনা গেলেও, তাঁরা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। সেই তুলনায় রিজভীর ব্যস্ততা কিছুটা কম এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতি, দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন ও সাংগঠনিক যোগাযোগে এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
অবশ্য মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দলের স্থায়ী কমিটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়েছে। তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার খবর নিয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, মহাসচিব নিজে এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না এবং দলের পক্ষ থেকেও তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।
রুহুল কবির রিজভীর রয়েছে এক দীর্ঘ ও ত্যাগী রাজনৈতিক ইতিহাস। বামপন্থি ছাত্র সংগঠন থেকে রাজনীতি শুরু করলেও পরে তিনি ছাত্রদলে যোগ দেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে তিনি পঙ্গুত্ববরণ করেন এবং সে সময় ৭ বার কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর ২০১৮ ও ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন রিজভী। এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় থেকে শুরু করে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমল পর্যন্ত তিনি মোট ৯ বার কারাবরণ করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আড়াইশর বেশি মামলা হয়। শত জেল-জুলুম সত্ত্বেও তিনি দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
দলের শীর্ষ নেতারা যখন কারাগারে বা নির্বাসনে ছিলেন, তখন নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে কার্যত নিজের আশ্রয়স্থল বানিয়ে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ৭৮৭ দিন সেখানে অবস্থান করে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখেন রিজভী। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের সহিংসতার পর পুলিশ কার্যালয়ে তালা দিলে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর নেতৃত্বেই সেই তালা ভেঙে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা। দলের দুঃসময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁর ঝটিকা মিছিলগুলো রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়েছিল।
বিএনপির তৃণমূল ও মহানগরের শীর্ষ নেতাদের মতে, দলের দুঃসময়ে এবং যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে রুহুল কবির রিজভীর কোনো বিকল্প নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য ‘ফুলটাইম’ কাজ করছেন এবং প্রতিটি জেলার সাংগঠনিক বাস্তবতা ভালো বোঝেন। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে সংগঠনের ধারাবাহিকতা ও সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয় বজায় রাখতে রিজভী আহমেদই সবচেয়ে যোগ্য উত্তরসূরি হবেন বলে মনে করছেন অনেকে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
