গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং পরিস্থিতি মারাত্মক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তীব্র গরমের মাঝে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহের দীর্ঘদিনের তীব্র সংকট মিলেই দেশের ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এক নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে সারা দেশজুড়ে তৈরি হওয়া লোডশেডিং প্রতিদিন ভাঙছে আগের সব রেকর্ড, আর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ঢাকার বাইরের গ্রাম ও মফস্বল এলাকার সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি এক বিকেলে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩,৭০০ মেগাওয়াটে। পিজিসিবির তথ্যমতে, দিনের একসময়ে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ৩,৬৭১ মেগাওয়াট বিশাল ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চরম হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি ও দেশের বিতরণ কোম্পানিগুলো। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ ভারত থেকে আদানির সরবরাহ করা বিদ্যুৎ অর্ধেকের নিচে নেমে আসা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ও মজুত কমে যাওয়ায় আদানি কর্তৃপক্ষ তাদের ১৬০০ মেগাওয়াটের জায়গায় প্রায় ৮১৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করছে। এর বাইরে অন্যান্য কারিগরি জটিলতা এবং কয়লা সংকটের কারণে দেশের বড়পুকুরিয়া, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এস আলম ও বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানির কেন্দ্রগুলোতেও পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে না।
একইভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বিশাল ধস নেমেছে। দেশে বিদ্যুৎ খাতের জন্য দৈনিক অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী অর্ধেক বিদ্যুৎও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ বিতরণে।
জ্বালানি খাতের এমন সংকটের নেপথ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সম্প্রতি ঘটা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটিও অন্যতম বড় কারণ। তবে টার্মিনালটি মেরামতের কাজ শেষ হলে তা থেকে পুনরায় পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভাসমান টার্মিনালগুলো থেকে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা সচল হবে, যা চলমান এই স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিং থেকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
