নয়া কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করে দিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলেই তিনি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান, মনোভাব ও প্রাপ্ত বার্তাগুলো সরাসরি নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সদর দপ্তরকে দ্রুত অবহিত করতেই এই আকস্মিক দিল্লি সফর। তবে এ বিষয়ে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
দিল্লি যাওয়ার আগে গতকাল সোমবার দুপুরে ভারতীয় দূত প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন। এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ রবিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন তিনি। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের দেড় মাসের মাথায় এই প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পান দীনেশ ত্রিবেদী।
এমন এক সময়ে এই শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হলো, যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নতুন করে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করতে দিল্লিকে জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও দ্রুত প্রত্যর্পণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে ধরনের সহায়ক ও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভারতীয় দূতের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কারণে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ নেওয়া নিয়ে এক ধরনের বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো সেই আমন্ত্রণে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সাড়া দেবে কি না, তা নিয়ে সরকার এখনও চূড়ান্ত কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এদিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের জনগণ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবসময় সামনের দিকে তাকাতে চান। তিনি আরও মন্তব্য করেন, দুটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যু বা সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে উভয় দেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা একটাই—তা হলো একটি সুদৃঢ় ও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা।
উল্লেখ্য, গত ২৫ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র পেশ করেছিলেন ভারতের এই নতুন হাইকমিশনার। এরপর গত ২৯ জুলাই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত এপ্রিলে ভারত সরকার তাদের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নিয়োগ দেয়। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এবারই প্রথম কোনো পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন ঝানু রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে, যিনি গত ৫ জুন স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
