ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দেশটির মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন—সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করলে।
বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফি ইরানের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরেছেন। তাঁর এই প্রতিবেদন বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য তৈরি করা হয় এবং পরে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়।
ধ্বংসস্তূপে শিশুর খাতা
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। একপর্যায়ে একটি শিশুর খাতা উদ্ধার করা হয়। খাতাটির প্রচ্ছদে লেখা ছিল মাহিয়া সালারি নাম। আট বছর বয়সী মাহিয়া ওই হামলায় নিহত হয়েছে বলে জানা যায়।
মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন তৈরি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় স্কুলটিতে ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাইনে নাদেমি বলেন, ‘এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে।’
মাহিয়া তার ছোট ভাই আলী ও মায়ের সঙ্গে স্কুলে ছিল। হামলায় তিনজনই নিহত হন। স্কুলের দেয়াল, সড়কের বাতির খুঁটি ও বিভিন্ন ভবনে এখনো নিহত শিশুদের ছবি টাঙানো রয়েছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষোভ
যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান নানা সংকটে ছিল। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ থেকে বছরের শুরুতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক অভিযান চালানো হয় বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন ভয়াবহ হলেও অনেক ইরানি নিজেদের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
আইনজীবী আজাদেহ বলেন, ইরানিদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাঁরা জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন রুটিন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ভয় রয়েছে।
রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, তিনি নিজের দেশকে ভালোবাসেন। কিন্তু তাঁর বয়স ও স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মনে হওয়ায় দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন।
ফুটবলারদের স্মৃতিতে যুদ্ধ
তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী প্রায় ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেনে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পরিবার ও তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলেন বিবিসির সাংবাদিক।
দুই তরুণ ফুটবলার যুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে জানান, সবচেয়ে বেশি মনে আছে স্কুলে হামলার ঘটনা। শিশুদের নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল বলে তাঁরা জানান।
কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ইরানের ঘরোয়া ফুটবল লিগ আবার শুরু হয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাব এখনো মানুষের জীবন ও মানসিকতায় স্পষ্ট।
বন্দর আব্বাসে থমকে গেছে অর্থনীতি
মিনাবের কাছেই বন্দর আব্বাস। এটি ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর এবং হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। শহরটিতে ইরানের নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। ফলে যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বন্দরনির্ভর মানুষের আয়-রোজগারেও বড় প্রভাব পড়েছে।
বন্দর এলাকায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো প্রণালি দিয়ে চলাচলের অপেক্ষায় নোঙর করে আছে। কয়েক মাসের অচলাবস্থায় অনেক জেলেরও আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
তেহরানে ভিন্ন চিত্র
বন্দর আব্বাসের যুদ্ধকবলিত পরিস্থিতির বিপরীতে তেহরানে যুদ্ধবিরতির সময়ে বড় ধরনের জনসমাগম দেখা যায়। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
রাজধানীর সড়কগুলোতে খামেনির ছবি টাঙানো হয় এবং বিপ্লবী সংগীত বাজানো হয়। মানুষের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগানও শোনা যায়। এতে একদিকে শোক, অন্যদিকে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রকাশ দেখা যায়।
তবে এই দৃশ্য ইরানের পুরো জনমতের প্রতিচ্ছবি কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ যুদ্ধ ও সরকার নিয়ে দেশটির মানুষের মধ্যে একক কোনো মত নেই।
কেউ মনে করেন, যুদ্ধ জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করেছে। আবার কেউ মনে করেন, এর ফলে সরকারের দমন-পীড়ন আরও বেড়েছে। তবে বছরের শুরুতে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তার সমাধান এখনো হয়নি।
যুদ্ধের উত্তরাধিকার কী হবে
মিনাবের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল থেকে বন্দর আব্বাসের অচল বন্দর এবং সেখান থেকে তেহরানের জনসমাগম—পুরো যাত্রায় ইরানের পরিবর্তিত চিত্রই উঠে এসেছে।
যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনে যেমন ভয়, শোক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে, তেমনি কারও কারও মধ্যে জাতীয় ঐক্যের অনুভূতিও জোরদার করেছে। আবার অনেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন।
যুদ্ধ এখনো চলমান। ফলে এই সংঘাত ইরানের রাজনীতি, সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
