সবকিছু ঠিক থাকলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। তার রাষ্ট্রপতি হওয়া চূড়ান্ত হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দলের মহাসচিব পদে কে দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব পদটি দলের সাংগঠনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপ ও মতপার্থক্য দূরে রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে মহাসচিবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলের কাউন্সিলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকায় এ পদটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব এবং তার নির্বাচনি আসন ঠাকুরগাঁও-১-এ উপনির্বাচনের বিষয়টিও সামনে আসবে।
বিএনপি অবশ্য বলছে, এসব পরিবর্তন দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে রোববার থেকে মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে।
রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ বা আগামীকালের মধ্যে দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। দলীয় আলোচনায় মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।
মির্জা ফখরুল দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী।
রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে এবং ১১ বার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর তিনি কারাবন্দি ছিলেন।
গত ১ আগস্ট গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৩ আগস্ট। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
মহাসচিব পদে কারা আলোচনায়
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন হবে—মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন।
দলীয় পর্যায়ে এ পদে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা চলছে।
তবে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও মহাসচিব পদে আলোচনায় রয়েছে। তারা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় সাংগঠনিক দায়িত্বের জন্য সরকারের বাইরে থাকা কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মহাসচিব পদে নিজের সম্ভাব্য দায়িত্ব নিয়ে জানতে চাইলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্যের সঙ্গে কাজ করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই তিনি দলের নেতাকর্মীদের পাশে রয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। দল দায়িত্ব দিলে তখন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন।
রিজভী মহাসচিব হলে নতুন সমীকরণ
রিজভীকে মহাসচিব করা হলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে।
দলের গঠনতন্ত্রে স্থায়ীভাবে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ নামে কোনো পদ নির্ধারিত নেই। তবে মহাসচিবের পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত থাকলে দলের চেয়ারম্যান তার সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে সাময়িকভাবে এ দায়িত্ব দিতে পারেন।
এদিকে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন ওই আসনে উপনির্বাচনের আয়োজন করবে।
