বিভিন্ন মহলে চলমান নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অচিরেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা ও দিল্লির নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, দুই দেশের কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক, স্থিতিশীল এবং জনকেন্দ্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই হবে হাই-প্রোফাইল এই দ্বিপক্ষীয় সফরের মূল লক্ষ্য। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের আগেই এই সফর সম্পন্ন হতে পারে, এমনকি চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরে যেতে পারেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে পাওয়া আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গত দুই বছরে বৃহৎ এই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে যে এক ধরনের শীতলতা ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সমমর্যাদা এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এটি হবে একটি বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এর পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব শীতলতা নেমে আসে, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনা ইস্যুতে আরও জটিল আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ, ভিসা কার্যক্রম স্থগিত, সীমান্তে উত্তেজনা এবং সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র তিক্ততা তৈরি হয়। তবে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে ফোন করে অভিনন্দন জানান এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। সম্পর্ক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদী মন্ত্রী পদমর্যাদায় ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দ্রুত প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হয়। বৈঠক শেষে দ্বিপক্ষীয় বার্তা নিয়ে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সরাসরি নয়াদিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা নেন।
কূটনীতিকদের মতে, ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ভিড়ে আলোচনার চেয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই দ্বিপক্ষীয় সফরটি ঢাকা-দিল্লির ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর হবে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি সরাসরি একান্ত বৈঠকে বসার সুযোগ পাবেন। ফলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, গত দুই বছরের বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, মানুষের যোগাযোগ সহজ করা এবং ট্রানজিট ও সীমান্ত সুরক্ষার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আস্থা ও সমঝোতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
