বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের শাসনকালকে ‘মূল্যায়নের সময়’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের ছয়টি প্রধান ব্যর্থতা জনসমক্ষে তুলে ধরেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটির অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের রাজনীতি বন্ধ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সরকার প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সরকারের কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসাও করে জেডিপি। দলটির মতে, দলমত নির্বিশেষে মতপ্রকাশের সুযোগ রাখা, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার চেষ্টাগুলো প্রশংসনীয়। তবে এসব ইতিবাচক উদ্যোগের আড়ালে সরকারের ছয়টি বড় ব্যর্থতা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে দাবি করে দলটি।
জেডিপির প্রথম অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো অধরা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সংসদ অধিবেশন শুরুর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়া এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে সরকারের রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দলটি। দ্বিতীয় ব্যর্থতা হিসেবে তারা শিক্ষাঙ্গনে পুনরায় লেজুড়বৃত্তি ও সংঘাতের রাজনীতি ফিরে আসার কথা উল্লেখ করেছে। কুয়েট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের উদাহরণ দিয়ে জেডিপি অবিলম্বে জড়িতদের বিচার এবং ছাত্ররাজনীতিকে ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক করার প্রস্তাব দেয়।
অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ হিসেবে জেডিপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি সংসদে উপস্থাপন না করে অতীতে স্বৈরাচারী সরকারের মতোই গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে অভিজ্ঞতাহীন এক ব্যবসায়ী ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেডিপি। দেশে চলমান গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা তৈরিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া দেড় কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান ও বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি ছয় মাসেও আলোর মুখ দেখেনি। শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করতে বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই বলেও সমালোচনা করা হয়।
ছয়টি প্রধান ব্যর্থতার পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলা, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংঘাত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়া এবং মাজারে হামলার মতো ঘটনাগুলোতে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার তীব্র সমালোচনা করেন নাঈম আহমাদ। তিনি স্পষ্ট জানান, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অন্ধ বিরোধিতা নয়, বরং জনগণের স্বার্থেই এই গঠনমূলক সমালোচনা করা হয়েছে। জেডিপি আশা করে, সরকার এই সমালোচনাগুলোকে রাজনৈতিক বৈরিতা হিসেবে না দেখে দ্রুত সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
