পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একসময় কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর বিভিন্ন মসজিদে জুমার দিনে জায়গার সংকুলান না হলে বহু মানুষ রাস্তায় নামাজ আদায় করতেন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে সেই সুযোগও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি, মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। এর প্রভাব পড়েছে জুমার আজান ও নামাজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও। ফলে মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা বাড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক ইমাম সম্প্রতি পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ও অসহায়তার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি মুসলিমদের স্বাধীনতা দিবসে নিজ নিজ বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান। তাঁর আশঙ্কা, তা না হলে মুসলিমদের সহজেই দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য রাজ্যের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভীতির বিষয়টি সামনে এনেছে।
মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার অভিযোগ ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টেও পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি হয়। মামলাকারীর আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদের মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি আগের একটি হাইকোর্টের রায়ের উল্লেখ করে মসজিদগুলোতে পুনরায় মাইক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানান। একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তবে রাজ্যের পক্ষ থেকে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতে জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে মাইক খুলে ফেলার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এমন নির্দেশ কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা দিয়েছেন—এমন প্রমাণও মামলাকারী দিতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর আরও বক্তব্য, প্রায় ৪ হাজার মাইক খুলে নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও কোনো ইমাম ব্যক্তিগতভাবে আদালতের দ্বারস্থ হননি। তাই অন্তর্বর্তী নির্দেশ না দিয়ে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়।
শুনানিতে আদালত জানতে চেয়েছে, কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক খোলা হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তালিকা ও তথ্য জমা দেওয়া যায় কি না। পাশাপাশি আজান দেওয়ার ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারে নির্ধারিত শব্দবিধি মানা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় এসেছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি ১৮ আগস্ট ধার্য হয়েছে এবং তার আগে রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলা হয়েছে।
এদিকে, এই বিতর্কের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, সরকার কোনো নতুন আইন কার্যকর করছে না; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনাই অনুসরণ করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় স্থান হিসেবে মন্দির ও মসজিদ—উভয়কেই একই নিয়মের আওতায় রাখা হয়েছে এবং প্রায় ৪২০০টি মসজিদ ও ১০৯৬টি মন্দির থেকে মাইক খোলা হয়েছে।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যায় সংখ্যালঘু সমাজের উদ্বেগ কাটছে না। তাঁদের একাংশের অভিযোগ, ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর পরোক্ষভাবে বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে আইনি বিতর্ক, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মসজিদের মাইক ব্যবহারকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই বিতর্ক রাজ্যের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্নও তৈরি করেছে।
