সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্প্রতি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যাকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে অভিহিত করছেন। মক্কায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার রূপরেখা রয়েছে।
ইসলামের পবিত্র নগরীতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, ন্যাটোর অন্যতম শীর্ষ সামরিক শক্তি তুরস্ক এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সৌদি আরবের এই জোটকে বহির্বিশ্বে ন্যাটো জোটের ‘অনুচ্ছেদ ৫’-এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিশ্লেষক মহলে এটিকে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ঢাল ও ‘ইসলামিক বোমা’র পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতার হিসাব আরও অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিল।
চুক্তির মূল ভাষা ন্যাটোর মতো শোনালেও বাস্তবে এটি কোনো একটি দেশের জন্য সামরিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন হামলা কিংবা হুতিদের লোহিত সাগরে চলাচলে হুমকির সময় পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক সম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তান সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানে নামেনি; কেবল কূটনৈতিক সংহতি ও বিবৃতি প্রদানেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এই চুক্তির প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত রয়েছে যৌথ প্রতিরক্ষা-বাস্তুতন্ত্র ও শিল্পভিত্তিক সহযোগিতায়। বর্তমানে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থ ও বাজার, তুরস্কের রয়েছে দ্রুত বর্ধনশীল ড্রোন, মহাকাশ ও নৌ-প্রতিনিধি প্রযুক্তি, এবং পাকিস্তানের রয়েছে সামরিক অভিজ্ঞতা, জনবল ও তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদনের সক্ষমতা। এই তিনটি দেশ মিলে যৌথ গবেষণা, অস্ত্র তৈরি এবং সামরিক প্রযুক্তি বিনিময়ের এক শক্তিশালী ভিত তৈরি করতে পারে।
সৌদি আরব মূলত মার্কিন নিরাপত্তার ওপর তাদের একচেটিয়া নির্ভরতা কমাতে বিকল্প কৌশলগত ‘বীমা’ হিসেবে এই জোটে যুক্ত হয়েছে। রিয়াদ তার পররাষ্ট্রনীতিতে চীন, রাশিয়া, ভারত এবং তুরস্ক-পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের বৈচিত্র্য এনে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে চায়। অন্যদিকে তুরস্কের লক্ষ্য পশ্চিমা জোটের বাইরে নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের প্রতিরক্ষা পণ্যের নতুন বাজার তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি ইরানকে সরাসরি ঘেরাও করার কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং অনিশ্চিত আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার এক প্রয়াস। মক্কার এই চুক্তি কোনো অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নির্মিত সামরিক জোট নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত বিকল্প বাড়ানো, প্রতিরক্ষা উৎপাদনকে শক্তিশালী করা এবং প্রতিটি দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি বাড়ানোর একটি হিসাবি পদক্ষেপ।
