দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই কেবল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে সফর নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ তাড়াহুড়ো না করার নীতি নিয়েছে। ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রচারিত খবরগুলোকে ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর আখ্যা দিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারপ্রধানের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। তিনি উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশকে অনুধাবন করতে হবে এবং দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট পাওয়া নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে তারা কী ধরনের সম্পর্ক চায়, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ সফরের যুক্তি নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
বাংলাদেশে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিদের ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে সেখানে কথা বলার সুযোগ দেওয়াকে ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে এবং ইতোমধ্যে ভারতের কাছে এ বিষয়ে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা হচ্ছে বলে জানান এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের স্বার্থে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হতে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সংযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সাথে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের বিষয়টিও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বোয়িং বিমান ক্রয়ের আলোচনা এগোনোর পাশাপাশি ইইউর সাথে পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে, যেখানে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) বিষয়ে জোরালো আলোচনা চলছে।
আফ্রিকায় নতুন বাজার তৈরি ও দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনার ফলে তৈরি হওয়া জটিলতা শিগগিরই কেটে যাবে এবং সেখানে কর্মী যাওয়ার পথ উন্মোচিত হবে। একই সাথে আফ্রিকা অঞ্চলে কনট্রাক্ট ফার্মিং ও বাংলাদেশি পণ্যের নতুন বাজার তৈরিতে বিশেষ কূটনৈতিক পদক্ষে নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়কে সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির বৈশ্বিক স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার ও চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর সুনির্দিষ্ট চাপ তৈরি করে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধান খোঁজা হবে।







