ফেসবুকে কোন কনটেন্ট কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেই হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে প্ল্যাটফর্মটির মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। নতুন নীতিতে মৌলিক ও মানসম্পন্ন কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নিম্নমানের, পুনরাবৃত্তিমূলক বা ব্যাপক হারে তৈরি এআইনির্ভর কনটেন্টের রিচ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেটার দাবি, এর লক্ষ্য প্রকৃত নির্মাতাদের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নকল ও পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্টের বিস্তার কমানো।
মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে কোনো কনটেন্টে মানুষের সৃজনশীল অবদান বা সম্পাদনা না থাকলে নিউজফিড ও রিলে তার প্রদর্শন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কনটেন্টের মৌলিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্মাতার প্রকৃত অবদান—মূল ধারণা, সম্পাদনা, ধারাভাষ্য কিংবা নিজস্ব উপস্থাপনা রয়েছে কি না—তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুধু অন্যের ভিডিও ডাউনলোড করে পুনরায় প্রকাশ করা, তাতে লোগো বা সাবটাইটেল যুক্ত করা কিংবা ভিডিওর গতি পরিবর্তনের মতো সামান্য সম্পাদনাকে মৌলিক কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করছে না মেটা।
চলতি বছরের মার্চে মেটার নিউজরুম থেকে প্রকাশিত এক ঘোষণায় বলা হয়, মৌলিক কনটেন্ট তৈরি করা নির্মাতাদের বেশি রিচ ও আয়ের সুযোগ দেওয়া হবে। বিপরীতে অমৌলিক কনটেন্টের বিস্তার কমিয়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কনটেন্ট চুরি ঠেকাতে সুরক্ষা সরঞ্জামও উন্নত করা হচ্ছে, যাতে নির্মাতারা সহজে চুরি হওয়া কনটেন্ট শনাক্ত করে অভিযোগ জানাতে পারেন।
এআই দিয়ে তৈরি ছবি, অডিও বা বাস্তবসদৃশ ভিডিওতে ‘মেড উইথ এআই’ লেবেল যুক্ত করার ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। চলতি বছরের মে থেকে সাধারণ পোস্টে এবং জুলাই থেকে বিজ্ঞাপনেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ধরনের লেবেল যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বাস্তবসদৃশ এআই-নির্মিত মানুষের উপস্থিতি থাকলে ‘স্পনসরড’ ট্যাগের পাশে স্পষ্টভাবে এআই লেবেল দেখানো হচ্ছে।
মেটাইজেশনের ক্ষেত্রেও নতুন নীতির প্রভাব পড়ছে। মেটা জানিয়েছে, কেবল এআই ব্যবহার করার কারণে কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্টের আয়ের সুযোগ বন্ধ করা হবে না। তবে মৌলিকত্বহীন, ব্যাপক হারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি কিংবা অন্যের কনটেন্ট পুনরায় প্রকাশ করা হলে সেসব কনটেন্টের মনিটাইজেশন বন্ধ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেসবুকের অ্যালগরিদম এখন আগের তুলনায় ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও কনটেন্টের মানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যবহারকারী যেসব পেজ অনুসরণ করেন না, সেসব পেজের কনটেন্টও উল্লেখযোগ্য হারে নিউজফিডে প্রদর্শিত হচ্ছে। এতে নতুন নির্মাতা ও ছোট পেজগুলোর সামনে যেমন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি কৃত্রিমভাবে এনগেজমেন্ট বাড়ানোর চেষ্টা করা কনটেন্টের রিচ কমার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রকৃত মন্তব্য, শেয়ার ও ব্যবহারকারীর স্বাভাবিক সম্পৃক্ততাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন আইনি কাঠামোর কারণে এআইনির্ভর কনটেন্ট সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রকাশের বিষয়টিও আরও কঠোর হয়েছে। ইইউভুক্ত ব্যবহারকারীদের দেখানো এআই-নির্মিত কনটেন্টে প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মেটার বিদ্যমান লেবেলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এর বড় অংশ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মেটার নতুন নীতি অনলাইন কনটেন্টের পরিবেশে মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যকে উৎসাহিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেসব পেজ বা ব্যক্তি কম শ্রমে, ব্যাপক হারে কিংবা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কনটেন্ট তৈরি করে আসছেন, তাদের রিচ ও আয়ে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
