ব্যক্তি, পরিবার, পেশা ও সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেছেন, কোনো একটি দায়িত্ব পালনে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য দায়িত্বকে অবহেলা করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
শনিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলা আয়োজিত দুই দিনব্যাপী শিক্ষাশিবিরের দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিক্ষাশিবিরে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও ঢাকা জেলা আমীর মাওলানা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন। সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো. আফজাল হোসাইন।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, দায়িত্বশীলদের প্রথম কাজ হলো নিজেদের সময়, কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। ব্যক্তিগত ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের অধিকারও যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। পরিবারকে সময় না দিয়ে শুধু সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত থাকা যেমন ঠিক নয়, তেমনি পারিবারিক ব্যস্ততার অজুহাতে সাংগঠনিক দায়িত্বে অবহেলাও কাম্য নয়।
তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্বও একজন দায়িত্বশীলের জন্য আমানত। কর্মক্ষেত্রে সততা, নিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পেশাগত দায়িত্বে অবহেলা করে সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা, কর্মবণ্টন, সময় ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
দায়িত্ব পালনে ভারসাম্য আনতে সময় ব্যবস্থাপনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কোন কাজ আগে করতে হবে, কোনটি অন্যের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব এবং কোন কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দায়িত্ব অর্পণ ও কর্মবণ্টনের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। সব কাজ নিজে করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
পরিবারকে একজন দায়িত্বশীলের শক্তির জায়গা উল্লেখ করে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে শান্তি ও শৃঙ্খলা থাকলে সমাজ ও সংগঠনের কাজেও একজন দায়িত্বশীল অধিক মনোযোগী ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা ও নিয়মিত পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বা সাপ্তাহিকভাবে নিজের কাজের হিসাব নিতে হবে—কোথায় সফলতা এসেছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে তা সংশোধন করা যায়। এর মাধ্যমে কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, পেশা ও সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব।
দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে তিনি বলেন, লক্ষ্য শুধু সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো নয়; বরং উত্তম চরিত্র, দায়িত্বশীলতা, আমানতদারি ও মানুষের কল্যাণের মাধ্যমে নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। ব্যক্তি জীবনে আদর্শ, পরিবারে দায়িত্বশীল, পেশায় সৎ ও দক্ষ এবং সংগঠনে সক্রিয়—এই চারটি গুণের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একজন দায়িত্বশীল প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারবেন।
শিক্ষাশিবিরে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় যুব বিভাগের সেক্রেটারি মঞ্জরুল ইসলাম ভূঁইয়া সংগঠন পরিচালনায় পরিকল্পনা, কর্মবণ্টন, বাস্তবায়ন ও তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, “ইসলামি আন্দোলনের একজন সংগঠকের দায়িত্ব হলো উত্তম পরিকল্পনা গ্রহণ, সঠিকভাবে কর্মবণ্টন, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, নিয়মিত তদারকি, কাজের পর্যালোচনা এবং যথাযথ রিপোর্টিং করা।”
মঞ্জরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সংগঠনের দায়িত্বশীলদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং অধীনস্থ এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু কর্মসূচি গ্রহণ করলেই হবে না; তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে তা পূরণ করা যায়—সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
শিক্ষাশিবিরের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে কুরআন থেকে দারস পেশ করেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা শরিফুল ইসলাম।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হলে প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে নিজের জীবনে ভারসাম্য, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর মাধ্যমে সংগঠন শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
তিনি জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মী গড়ে তোলার মাধ্যমে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দায়িত্বশীলদের নিয়মিত অধ্যয়ন, আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক পরামর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
দুই দিনব্যাপী শিক্ষাশিবিরে জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুর রউফ ও অধ্যক্ষ মো. শাহীনুর ইসলাম, জেলা সহকারী সেক্রেটারি এবিএম কামাল হোসাইন ও মাওলানা শাহাদাত হোসাইন, জেলা রাজনৈতিক সম্পাদক হাসান মাহবুব মাস্টার, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট মো. শহিদুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক কবিরুজ্জামান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক লুৎফর রহমান মোল্লা, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আঃ রহীম মজুমদার, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আসাদুজ্জামান জীম, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস, ইমদাদুল হক, অধ্যাপক আব্দুল কাদের ও কাজী বেলালসহ জেলা ও থানার বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সাভার পৌর আমীর আজিজুর রহমান, সাভার থানা আমীর আব্দুল কাদের, আশুলিয়া থানা আমীর বশির আহমেদ এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার আমীর ইলিয়াস হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা শিক্ষাশিবিরে অংশ নেন।
শিক্ষাশিবিরের সমাপনী অধিবেশনে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
